যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তি: পারমাণবিকচালিত সাবমেরিন নির্মাণে অনুমতি পেল দক্ষিণ কোরিয়া
কোরীয় উপদ্বীপে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। গত বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, সিউলকে পারমাণবিকচালিত ‘অ্যাটাক সাবমেরিন’ নির্মাণে অনুমোদন দিয়েছে ওয়াশিংটন। পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতায়ও সম্মতি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে বিশ্বে মাত্র ছয়টি দেশের হাতে এই ধরনের সাবমেরিন রয়েছে; সেই তালিকায় যুক্ত হতে যাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আনবে।
এই চুক্তির প্রেক্ষাপটে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া নতুন বাণিজ্য চুক্তি করে, যেখানে দুই দেশ পরস্পরের শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামাতে সম্মত হয়। এর বিনিময়ে সিউল যুক্তরাষ্ট্রে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। এরপরই সাবমেরিন প্রকল্পে সবুজ সংকেত আসে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লেখেন, দক্ষিণ কোরিয়াকে পুরোনো ডিজেল নয়, বরং আধুনিক পারমাণবিকচালিত সাবমেরিন তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে নির্মাণস্থল নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। ট্রাম্পের দাবি—শিপইয়ার্ড হবে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায়, যা হানহোয়ার মালিকানাধীন। কিন্তু সিউলের মতে, সময়সীমা ও সক্ষমতার কারণে সাবমেরিন স্থানীয়ভাবে নির্মিত হওয়াই যৌক্তিক।
সিউলের পারমাণবিকচালিত সাবমেরিন অর্জনের মূল কারণ উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক অবস্থান। গত বছর পিয়ংইয়ং নিজেদের সম্ভাব্য পারমাণবিকচালিত সাবমেরিনের ছবি প্রকাশ করে, যা কয়েক বছরের মধ্যে চালু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহন গিউ–বাক বলেন, নতুন সাবমেরিন দেশটির নজরদারি ও প্রতিরোধক্ষমতা আরও শক্তিশালী করবে। তার ভাষায়, সাবমেরিনগুলোর নীরবতা ও দ্রুতগতি “কিম জং উনকে রাতে জাগিয়ে রাখবে।”
বিশ্লেষকদের ধারনা, উত্তর কোরিয়ার হাতে বর্তমানে প্রায় ৫০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, যা এখন “অবিস্মরণীয় বাস্তবতা।” নতুন সাবমেরিন প্রকল্প সিউলকে আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতায় আরও সুদৃঢ় অবস্থানে নিয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও সাবমেরিনগুলো দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতায় নাটকীয় পরিবর্তন না আনলেও রাজনৈতিকভাবে এর গুরুত্ব বেশি হবে। কারণ দক্ষিণ কোরিয়া নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে না—এ অবস্থায় এই সাবমেরিনই জনমনে দৃশ্যমান শক্তি প্রদর্শন করবে।
এই প্রকল্পকে যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য রক্ষার অংশ হিসেবে দেখছে। উত্তর কোরিয়া এবং চীনের ওপর চাপ ধরে রাখতে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোকে ওয়াশিংটনের কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে তাতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে চীন। সিউলে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত দাই বিং বলেছেন, দক্ষিণ কোরিয়া যেন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের উদ্বেগ বিবেচনা করে।
এখন দুই দেশের বিদ্যমান পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিতে পরিবর্তন আনা হবে, যাতে সামরিক ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের নিয়মও নির্ধারণ করা হবে। এদিকে হানহোয়া সাবমেরিন নির্মাণ সক্ষমতা নিয়ে এখনও কোনো মন্তব্য করেনি, তবে সিউল বলছে, দ্রুত কাজ শুরু করতে দেশীয় শিপইয়ার্ডই সর্বোত্তম বিকল্প।