গোমাংস খাওয়া কেন্দ্র করে গণপিটুনির মামলা তুলে নেওয়ার আবেদন ভারতে
ভারতের উত্তর প্রদেশে ২০১৫ সালে গুজবের ভিত্তিতে পিটিয়ে হত্যা করা মোহাম্মদ আখলাকের মামলাটি প্রত্যাহারের অনুমতি চেয়ে রাজ্য সরকার আদালতে আবেদন করেছে। গত মাসে গ্রেটার নয়ডার একটি আদালতে এ আবেদন দাখিল করা হয়।
আখলাকের পরিবারের আইনজীবী মোহম্মদ ইউসুফ সাইফি জানিয়েছেন, মামলায় বর্তমানে ১৮ জন অভিযুক্ত রয়েছেন, এবং সবাই জামিনে আছেন। সরকারের আবেদনে বলা হয়েছে—সাক্ষীদের বয়ানে অসঙ্গতি রয়েছে এবং ‘সামাজিক সম্প্রীতি পুনরুদ্ধারের’ স্বার্থে মামলাটি প্রত্যাহার করা প্রয়োজন। আগামী ১২ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
তবে নিহত আখলাকের পরিবার বলেছে, ন্যায়বিচারের জন্য তারা লড়াই চালিয়ে যাবেন।
২০১৫ সালের রাতের সেই ঘটনা
ঘটনাটি ঘটে ২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর, উত্তর প্রদেশের দাদরির বিসাহরা গ্রামে। রাতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে ৫০ বছর বয়সী আখলাক গরুর মাংস খেয়েছেন এবং ঘরে মজুত রেখেছেন। এ গুজবের ভিত্তিতে লাঠি, লোহার রড, তলোয়ার ও পিস্তলধারী একদল মানুষ তার বাড়িতে হামলা চালায়। এতে আখলাক নিহত হন এবং তার ২২ বছর বয়সী ছেলে দানিশ গুরুতর আহত হন।
পরিবারের দাবি, আখলাকের ফ্রিজে যে মাংস পাওয়া গিয়েছিল তা ছিল খাসির—অন্যদিকে স্থানীয় গুজব ছড়ানো হয় যে সেটি গরুর মাংস।
গো-সংক্রান্ত সহিংসতার আলোচনায় প্রথম বড় মামলা
উত্তর প্রদেশে গোহত্যা নিষিদ্ধ। গোমাংসের গুজব ঘিরে সহিংসতার ঘটনাগুলোর মধ্যে আখলাকের হত্যাকাণ্ডই প্রথম যা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া এবং কয়েকজন বিজেপি নেতার বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে তখন সমালোচনা হয়েছিল।
মামলার অগ্রগতি ও বিতর্ক
ঘটনার পরপরই কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ চার্জশিটে ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে—এদের মধ্যে একজন নাবালক এবং এক স্থানীয় বিজেপি নেতার ছেলেও ছিল। পরে আসামির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ জনে।
২০১৬ সালে জেলে থাকা অভিযুক্ত রবিন সিসোদিয়ার মৃত্যু হলে গ্রামে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তাকে ‘শহীদ’ও বলা হয়েছিল। পরিবার সৎকারে অস্বীকৃতি জানালে তার দেহ কয়েকদিন গ্রামে রাখা হয়। পরে সরকার ও দুই বিজেপি নেতা ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিলে দাহ করা হয়।
বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি
মামলার বিচার শুরু হয় ২০২১ সালে। এখন পর্যন্ত মাত্র একজন সাক্ষীর জবানবন্দি নেয়া হয়েছে। রাজ্য সরকারের নতুন আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে—ফরেনসিক রিপোর্টে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত মাংস গরুর মাংস বলে উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে আখলাকের পরিবার বরাবরই দাবি করে এসেছে—এটি খাসির মাংস ছিল। তাদের বিরুদ্ধে গোহত্যা আইনে যে পাল্টা মামলা করা হয়েছিল সেটিও এখনো বিচারাধীন।
পরিবারের আইনজীবী সাইফির অভিযোগ—পরিবারকে চাপ দিতে এই পাল্টা মামলা করা হয়। তিনি জানান, স্থানীয় এক পশুচিকিৎসকের প্রাথমিক পরীক্ষায় তখনই বলা হয়েছিল যে মাংসটি গরুর নয়।
রাজ্য সরকারের মামলাটি প্রত্যাহারের উদ্যোগে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—“গণপিটুনির মতো গুরুতর মামলা কি এভাবে প্রত্যাহার হয়ে যাবে?”
সূত্র: বিবিসি বাংলা