৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলে ঋণ বিতরণে ধীরগতি, নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক
বন্ধ কলকারখানা চালু করা এবং অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর লক্ষ্যে ঘোষিত ৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ বিতরণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি নেই। তহবিল ঘোষণার চার মাস পার হলেও গত মাস পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে। এর মধ্যে গ্রাহকদের হাতে সরাসরি পৌঁছেছে এক হাজার কোটি টাকারও কম। বন্ধ কারখানা চালুর জন্য ঋণ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৫০ কোটি টাকা।
এ পরিস্থিতিতে ঋণ বিতরণ বাড়াতে শর্ত শিথিল এবং সুদহার কমানোর উপায় খুঁজছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা ও সাবেক ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থনীতিকে সচল করতে ১৮০ দিনের নতুন কর্মপরিকল্পনা ঘোষণার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
গত মে মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করা হয়। পরে এর পরিমাণ বাড়িয়ে ৬২ হাজার কোটি টাকা করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে এবং ২১ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে বিতরণ করার কথা। এই তহবিলের ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ শতাংশ।
ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা বন্ধ শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠান চালুর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা এবং রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে রাখা হয়েছে আরও তিন হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত মাস পর্যন্ত তহবিল থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, উত্তরবঙ্গের কৃষি কেন্দ্র এবং কৃষি খাতের জন্য বরাদ্দ তহবিল থেকে কোনো ঋণ বিতরণ হয়নি।
ঋণ বিতরণে গতি বাড়াতে মঙ্গলবার ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক ব্যাংকারদের সঙ্গেও আলোচনা করা হয়।
ব্যবসায়ী নেতারা বন্ধ ও আংশিক বন্ধ কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা, সম্পদ, নগদ অর্থের প্রবাহ এবং ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য যাচাই করে অর্থায়নের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁদের মতে, ঋণখেলাপি হওয়াকে একমাত্র অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা না করে প্রকল্পের সম্ভাবনা ও বাস্তব অবস্থা যাচাই করে ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখা উচিত।
এ ছাড়া ঋণ অনুমোদন ও বিতরণপ্রক্রিয়া সহজ করা, খেলাপিমুক্ত হতে নগদ অর্থ জমা দেওয়ার শর্ত শিথিল করা এবং ব্যাংকগুলোর ওপর তদারকি বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন তাঁরা।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বন্ধ কলকারখানা চালুর বিকল্প নেই। নতুন কারখানা স্থাপনে কয়েক বছর সময় লাগলেও বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা তুলনামূলক কম সময়ে সম্ভব। এ কারণে প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত শিথিল করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ঝুঁকি বিবেচনা করে ঋণ দেওয়া ব্যাংকগুলোর অন্যতম দায়িত্ব। বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ থাকায় বন্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরীও যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, শুধু বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে ঋণ দেওয়া হলে ব্যাংক খাতে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, অর্থনীতির গতি ফেরানোর উদ্দেশ্যে প্রণোদনা তহবিল গঠন করা হয়েছে এবং এর আওতায় ঋণ বিতরণ চলছে। বিতরণের গতি বাড়াতে আরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে।