মঙ্গলবার , ২৭ অক্টোবর ২০২৬
মঙ্গলবার , ২৭ অক্টোবর ২০২৬
হোম › বিশ্ব › নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান, নাকি আবারও ক্ষমতায় ফেরার চমক?

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান, নাকি আবারও ক্ষমতায় ফেরার চমক?

favicon
ভোরের আলো ডেস্ক:
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান, নাকি আবারও ক্ষমতায় ফেরার চমক?

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির রাজনীতিতে অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। নানা সংকট, রাজনৈতিক বিরোধিতা ও ক্ষমতা হারানোর পরও বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর নজির রয়েছে তাঁর। তবে যুদ্ধ পরিচালনা, অভ্যন্তরীণ নীতি এবং জনসমর্থন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এবার বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন তিনি। প্রশ্ন উঠেছে, এবারের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটবে, নাকি আবারও ক্ষমতায় ফিরবেন তিনি?


ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণের কথা রয়েছে। ভোট শেষে দেশটির সম্প্রচারমাধ্যমগুলো সম্ভাব্য ফলাফল প্রকাশ শুরু করবে।


২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা, গাজা ও লেবাননে যুদ্ধ এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাত নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। গত চার বছর ধরে কট্টর ডানপন্থি ও কট্টর অর্থোডক্স ইহুদিদের সমর্থনে সরকার পরিচালনা করছেন তিনি। ফলে এবারের নির্বাচন শুধু তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় নীতি ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


### জনসমর্থনে পিছিয়ে নেতানিয়াহু


নির্বাচনের আগে প্রকাশিত বিভিন্ন জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান গাদি আইজেনকটের তুলনায়ও পিছিয়ে থাকতে পারেন তিনি। নির্বাচনের পর সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করাও নেতানিয়াহুর জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।


তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এখনই তাঁর রাজনৈতিক বিদায় নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ও হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গিডিওন রাহাতের মতে, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠীর সমর্থন নেতানিয়াহুকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। এগুলো হলো কট্টর অর্থোডক্স ইহুদি, কট্টর ডানপন্থি এবং তাঁর ব্যক্তিগত সমর্থকগোষ্ঠী।


কট্টর অর্থোডক্স ইহুদিদের একটি বড় অংশ বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে, কট্টর ডানপন্থিদের অন্যতম লক্ষ্য পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ এবং ওই অঞ্চলে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা। নেতানিয়াহুর শাসনামলে এসব গোষ্ঠীর বিভিন্ন দাবি ও লক্ষ্য অগ্রাধিকার পেয়েছে।


রাহাতের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেতানিয়াহু এমন একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমর্থনভিত্তি গড়ে তুলেছেন, যার অনুসারীদের অনেকে মনে করেন, ইসরায়েল পরিচালনার জন্য তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। নেতানিয়াহুও নিজের রাজনৈতিক পরিচয়কে রাষ্ট্রের পরিচয়ের সঙ্গে এক করে উপস্থাপন করেন। ফলে তাঁর সামরিক সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার পাশাপাশি পরিচয় ও আদর্শের প্রশ্নটিও সমর্থকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


### সমর্থকদের কাছে এখনো আস্থার প্রতীক


নেতানিয়াহুর সমর্থকদের একটি অংশের বিশ্বাস, ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে এমন একটি অদৃশ্য ক্ষমতাবলয় রয়েছে, যা তাঁর বিরোধিতা করে। তাঁদের মতে, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের বাধার কারণে নেতানিয়াহুকে নানা সংকটের মুখে পড়তে হয়েছে। এ কারণে ৭ অক্টোবরের হামলার মতো বড় ব্যর্থতার জন্যও তাঁকে এককভাবে দায়ী করা উচিত নয় বলে মনে করেন তাঁরা।


তেল আবিবের কাছাকাছি বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জোনাথন রাইনহোল্ডের মতে, ইসরায়েলের রাজনীতিতে নেতানিয়াহুর মতো দক্ষ কৌশলী রাজনীতিক খুব কমই দেখা গেছে। প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা এবং নিজের ভাবমূর্তি গড়ে তোলার দক্ষতা তাঁকে দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রে রেখেছে।


তবে তাঁর সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে গত চার বছরে অসন্তোষ বেড়েছে। বিচারব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগকে বিরোধী ও সমালোচকদের অনেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছেন। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীতে জনবলের সংকট থাকা সত্ত্বেও কট্টর অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে সরকার কার্যকর সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি।


এ ছাড়া কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। রাইনহোল্ডের আশঙ্কা, নেতানিয়াহু আবারও প্রধানমন্ত্রী হলে এসব সমস্যা আরও গভীর হতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হতে পারে।


### অতীতের রাজনৈতিক সংকটও বড় পরীক্ষা


নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতা হারানো ও ফিরে আসার ঘটনা নতুন নয়। ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে ইসরায়েলে চার দফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০২১ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের উদ্যোগে গঠিত জোট সরকারের কাছে ক্ষমতা হারান তিনি। এর আগে ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর নির্বাচনে পরাজিত হয়ে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে।


এবার দুর্নীতির মামলার বিচারপ্রক্রিয়া, যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে সমালোচনা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং অভ্যন্তরীণ নীতিগত বিরোধ তাঁর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সমালোচকদের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের স্বার্থের চেয়ে জোটসঙ্গীদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক লক্ষ্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে তাঁর সরকার।


আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কা নিয়েও সম্প্রতি কথা বলেছেন নেতানিয়াহু। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প ক্রিপ্টো অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা করেছেন তিনি।


### ট্রাম্পের সমর্থনেও কি বদলাবে ভোটের হিসাব?


নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন পেয়েছেন নেতানিয়াহু। তবে জনমত জরিপের ফল বলছে, ট্রাম্পের এই সমর্থন ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেনি।


গত ১৮ অক্টোবর ট্রাম্পের সমর্থন ঘোষণার পরদিন ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ নিউজের এক জরিপে দেখা যায়, ৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, এই ঘোষণা তাঁদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলবে না। ১৭ শতাংশ বলেছেন, এতে নেতানিয়াহুকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা কমেছে। অন্যদিকে, প্রায় ১২ শতাংশ জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সমর্থন তাঁদের লিকুদ পার্টিকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় করেছে।


একই জরিপে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গাদি আইজেনকটের প্রতি তুলনামূলক বেশি সমর্থন দেখা যায়। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন ৩৩ শতাংশ।


জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টি ২১টি আসন পেতে পারে। বর্তমানে বিদায়ী পার্লামেন্ট নেসেটে দলটির আসনসংখ্যা ৩২। অন্যদিকে, আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি ২৪টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।


### বিরোধীদের দুর্বলতাও হতে পারে নেতানিয়াহুর শক্তি


তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের বারাক লিডারশিপ সেন্টারের প্রধান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক উদি সোমারের মতে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করছে না; বিরোধী দলগুলোর অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।


সোমারের মতে, ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ও পরে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে বিভিন্ন ব্যর্থতা থাকলেও বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদের ভূমিকাও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। সরকারের ব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জনঅসন্তোষকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলো প্রত্যাশিত কার্যকারিতা দেখাতে পারেনি বলে মনে করেন তিনি।


সোমারের ধারণা, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট আসন হারালেও ইসরায়েলের রাজনীতিতে ডানপন্থি প্রবণতা, জোটসঙ্গীদের সঙ্গে জনমতের একাংশের মিল এবং বিরোধী দলগুলোর দুর্বলতা তাঁকে ক্ষমতায় টিকে থাকার সুযোগ করে দিতে পারে।


একসময় নেসেটে ২৪টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের নেতৃত্ব দেওয়া লাপিদের রাজনৈতিক প্রভাবও কমেছে। ভবিষ্যতে তাঁর দলের আসনসংখ্যা মাত্র দুটিতে নেমে আসতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সোমার।


### সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা


নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহু কিংবা বিরোধী জোট—কোনো পক্ষেরই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। ফলে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরও সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যেতে পারে।


সম্ভাব্য পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন দুই বৃহত্তম দলের মধ্যে মধ্যপন্থি জোট গঠন কিংবা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে আবারও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া। এমন পরিস্থিতিতেও নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।


রাজনীতি থেকে অবসরের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে ইতিমধ্যে জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠী এবং জোট গঠনের কৌশল কাজে লাগিয়ে তিনি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারেন কি না, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন। নাকি এবারের নির্বাচনই ইসরায়েলের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ আধিপত্যের অবসানের সূচনা করবে—তার উত্তর মিলবে নির্বাচনের ফলাফল ও পরবর্তী সরকার গঠনের সমীকরণে।