ইসরায়েলের নির্বাচনে চাপে নেতানিয়াহুর জোট, সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা
ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর মুখে পড়েছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ভোটগ্রহণ শেষে প্রকাশিত বুথফেরত জরিপে দেখা গেছে, ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা কম নেতানিয়াহুর জোটের। তবে বিরোধী দলগুলো এগিয়ে থাকলেও তাদের সরকার গঠনের পথ সহজ নয়।
ইসরায়েলের প্রধান তিনটি টেলিভিশন চ্যানেল—১১, ১২ ও ১৩-এর বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর সমর্থক জোট ৫০ থেকে ৫১টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে, ইহুদি-নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলো পেতে পারে ৫১ থেকে ৫২টি আসন। বাকি আসনগুলো আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ঝুলিতে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
তবে বুথফেরত জরিপের ফলাফলই চূড়ান্ত নয়। ভোট গণনা শেষে আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের পরই নির্বাচনের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
### লিকুদ সবচেয়ে বড় দল হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনিশ্চিত
বুথফেরত জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টিকে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে দেখানো হয়েছে। দলটি ২৪ থেকে ২৫টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালের নির্বাচনে দলটি ৩২টি আসন পেয়েছিল।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ইয়াশার পার্টি ২১ থেকে ২৩টি আসন পেতে পারে। একক দলের আসনসংখ্যায় লিকুদের পেছনে থাকলেও সামগ্রিক জোটগত সমীকরণে বিরোধী শিবির এগিয়ে থাকতে পারে।
জরিপে আরও দেখা গেছে, বিরোধী দল বিয়াখাদ ১২ থেকে ১৩টি আসন পেতে পারে। আরব-নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট পেতে পারে ১১টি আসন। ডেমোক্র্যাটস পার্টি ৯ থেকে ১০টি এবং ইসরায়েল বেইতেনু ৭ থেকে ৮টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া আরব-নেতৃত্বাধীন রা'আম ৭টি আসন পেতে পারে। অতি-রক্ষণশীল শাস পার্টি ৬ থেকে ৮টি, ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইজম ৬ থেকে ৭টি এবং উগ্র ডানপন্থি ওতজমা ইয়েহুদিত ৬ থেকে ৭টি আসন পেতে পারে বলে জরিপে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
### আরব দলগুলোকে ঘিরে বিরোধীদের জটিলতা
নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা। কারণ, বিরোধী শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতা আগেই আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে জোট সরকার গঠন না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
অথচ বুথফেরত জরিপের হিসাব অনুযায়ী, আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন ছাড়া বিরোধীদের পক্ষে ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কঠিন হতে পারে।
জয়েন্ট লিস্ট ও রা'আম—দুই দলই নেতানিয়াহুর আরেক মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিরোধী। ফলে এসব দলের সমর্থন বিরোধী শিবিরের সরকার গঠনের হিসাব পাল্টে দিতে পারে। তবে সরাসরি জোট গঠন ছাড়াও আস্থা ভোটে সমর্থন কিংবা ভোটদানে বিরত থাকার মতো বিকল্প নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
তবে ইসরায়েল বেইতেনুর নেতা আভিগদর লিবারম্যান এবং বিয়াখাদের নেতা নাফতালি বেনেট আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছেন। ফলে বিরোধী শিবিরের মধ্যে সমঝোতা না হলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
### নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অনাস্থার বার্তা বিরোধীদের
বুথফেরত জরিপে বিরোধী শিবির এগিয়ে থাকার পূর্বাভাস প্রকাশের পর গাদি আইজেনকোট ফলাফলকে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থার প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, এই ফলাফল ইসরায়েলের অধিকাংশ নাগরিকের পক্ষ থেকে নেতানিয়াহু এবং ৭ অক্টোবরের হামলার সময় ক্ষমতায় থাকা সরকারের প্রতি অনাস্থার ইঙ্গিত দেয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলার পর থেকে নেতানিয়াহুর সরকারের নিরাপত্তানীতি ও যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বিতর্ক চলছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় আইজেনকোট বলেন, চূড়ান্ত ফলাফল বুথফেরত জরিপের সঙ্গে মিললে তা ইসরায়েলের দায়িত্বশীল জাতীয়তাবাদী শিবিরের বিজয় হবে। তিনি জনগণের রায় বাস্তবায়ন এবং দ্রুত নতুন সরকার গঠনের অঙ্গীকার করেন।
তবে সরকার গঠনের জন্য আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে বিরোধী শিবিরের অবস্থান এখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে রয়েছে।
### সরকার গঠনে প্রেসিডেন্টের ভূমিকা
নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর নেতানিয়াহু ও আইজেনকোট—উভয়েই সরকার গঠনের সুযোগ চাইতে পারেন প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে। সাধারণত যিনি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন নিশ্চিত করার সম্ভাবনা বেশি দেখাতে পারেন, তাঁকেই সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
কোনো প্রার্থীই সরকার গঠনে সফল না হলে দেশটিতে নতুন করে নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহু দায়িত্বে থাকতে পারেন।
এর আগে ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ইসরায়েলে দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে পাঁচবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবারের নির্বাচনের ফলাফলও যদি সরকার গঠনের জটিলতা তৈরি করে, তাহলে দেশটির রাজনীতিতে আবারও অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
### বুথফেরত জরিপে ভিন্ন চিত্র
ইসরায়েলের সব টেলিভিশন চ্যানেলের জরিপে অবশ্য একই চিত্র উঠে আসেনি। চ্যানেল ১১, ১২ ও ১৩-এর জরিপে বিরোধী শিবির সামান্য এগিয়ে থাকলেও সরকারপন্থি হিসেবে পরিচিত চ্যানেল ১৪-এর বুথফেরত জরিপে নেতানিয়াহুর জোট ৬২টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, আই-২৪ নিউজের জরিপে নেতানিয়াহুর জোট ৫৫টি এবং বিরোধী শিবির ৪৯টি আসন পেতে পারে বলে জানানো হয়েছে। চ্যানেল ১৬-এর জরিপে নেতানিয়াহুর জোটের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৫৩ এবং বিরোধীদের ৫১টি দেখানো হয়েছে।
জরিপগুলোর এই পার্থক্য নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে। অতীতেও বুথফেরত জরিপের সঙ্গে চূড়ান্ত ফলাফলের পার্থক্য দেখা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ৭৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, বুথফেরত জরিপে নেতানিয়াহুর জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ইঙ্গিত মিললেও তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখনই নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। চূড়ান্ত ফলাফল এবং বিভিন্ন দলের মধ্যে সরকার গঠন নিয়ে সম্ভাব্য সমঝোতাই নির্ধারণ করবে, ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার কার নেতৃত্বে গঠিত হবে।