ক্ষমতার দাপটে পিতাকে মারধর শোকে মৃত্যু, মাকে কারাগারে পাঠিয়ে বাড়িছাড়া করেছে বৃদ্ধা মাসহ ভাই-বোনদের
আইনের আশ্রয়ে মানুষ খোঁজে ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা আর আস্থার জায়গা। কিন্তু সে আইনকেই অপব্যবহার করে যদি কেউ নিজের পরিবারকেই নিংস্ব করে তোলে তবে শুধু একটি পরিবারে সংকট নয়, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের ভয়াবহ উদাহরণ।
এমনই এক ঘটনা ঘটেছে নোয়াখালী সদর উপজেলার এওজবালিয়া ইউনিয়নে মান্নান নগর এলাকায় আবুল খায়ের ব্যাপারী বাড়িতে। যেখানে ছেলে পেশায় একজন আইনজীবীর সহকারী মুহুরী ক্ষমতার দাপটে নিজের বাবা-মা ও ভাইবোনদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দিয়ে তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। অভিযোগ আছে, নিজ পিতাকে মারধর করার নির্যাতনের শোক সহ্য করতে না পেরে মারা যায় পিতা। আর স্বাক্ষর জালিয়াতি করে মাকে পাঠায় কারাগারে।দেড় মাস কারাগারে ছিলেন বৃদ্ধা মা।এ ঘটনায় শুধু মা নন, পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও রেহাই পাননি। ভাইবোনদের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা দায়ের করেছেন তিনি। নিয়মিত হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন তাদের। ফলে দীর্ঘদিন ধরে নিজের বসতভিটায় ফিরতে পারছেন না মা ও অন্যান্য ভাইবোনরা। নিরাপত্তাহীনতায় তারা দিন কাটাচ্ছেন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে।
বৃহস্পতিবার বিকালে ভুক্তভোগী বৃদ্ধা নারী সুধারাম মডেল থানায় ছেলের অত্যাচার নির্যাতনের প্রতিবাদে মামলা দায়ের করতে গেলে এখনোও মামলা নেয় নি পুলিশ।এরআগেও তিনি সুধারাম মডেল থানা সাধারণ ডায়েরি(জিডি) ও জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ করে কোনো প্রতিকার পান নি।মুহুরির প্রভাব খাটিয়ে ওই বৃদ্ধার ছেলে জাকির হোসেন নিজ মাকে আসামী করে তিনটি মামলা দায়েরও করেন।
এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়,বৃদ্ধা মায়ের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ছেলে পেশায় একজন আইনজীবী সহকারী, মুহুরী। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী এ ব্যক্তি আইনের ফাঁকফোকর আর নিজের পেশাগত সুবিধা ব্যবহার করে পরিবারকে জিম্মি করে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।পরিবারের সদস্যদের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নানা ধরনের নির্যাতন চালিয়ে আসছেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, তিনি নিজের জন্মদাতা পিতার গায়েও হাত তোলেন। স্থানীয়রা জানান,এ ঘটনার পর থেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন বৃদ্ধ পিতা। পরিবারের অভিযোগ সেই শোক আর অপমান সহ্য করতে না পেরে কিছুদিনের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি।কিন্তু এখানেই শেষ নয়। অভিযোগের তালিকা আরও দীর্ঘ। পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ কর জানান, পিতার মৃত্যুর পর সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে নিজের মায়ের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে মামলা করেন ওই মুহুরী। শুধু তাই নয় মায়ের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে একটি মামলায় জড়িয়ে নিরপরাধ এই বৃদ্ধা নারীকে প্রায় দেড় মাস কারাগারে কাটাতে হয়।এ নির্মম ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র নিন্দার ঝড় বইছে। অনেকেই এটিকে পারিবারিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় হিসেবে দেখছেন। কেউ কেউ বলছেন আইনের পেশায় থেকে এমন কর্মকাণ্ড শুধু অপরাধ নয়, বরং পুরো পেশার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে।নিজ ছেলের এমন কর্মকান্ডে বাকরুদ্ধ মা বিবি খাদেজা।নিজ ছেলে তাকে জেলে পাঠাইছে।একাধিক মামলা দিয়ে বাড়িতে যেতে দিচ্ছে না।মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।এ সময় তিনি ছেলের কঠোর বিচারের দাবি জানান।
বৃদ্ধ নারীর ছেলে ভুক্তভোগী কামাল হোসেন জানান,আমার ভাই জাকির হোসেন পেশায় মুহুরি হলেও ভাবখানা ম্যাজিট্টেটের মত।
আমাদের বাবাকে সে কিল-ঘুষি মেরেছে, অপমান করেছে। বাবা কষ্টে কষ্টে মারা গেছে। আমরা তার বিচার চাই।তার অত্যাচার ও একের পর এক হয়রানীমূলক মামলায় আমরা ভাই-বোনেরা নিজেদের বাড়িতে যেতে পারি না। গেলে মেরে ফেলবে বলে হুমকি দেয়। আমরা এখন পালিয়ে পালিয়ে থাকি।এ সময় মুহুরী জাকির হোসেনের শাস্তি দাবি জানান তিনি।
বৃদ্ধ নারী মেয়ে ফাতেমা বেগম ও ছোট ছেলে ইকবাল হোসেন জানান,জাকির হোসেনের কারণে আমাদের বাবা অপমান সইতে না পেরে কষ্ট মারা গেছে।বাবার গায়ে সে হাত তুলেছে,মারধর করেছে।আমাদের মাকে ও সে দেড়মাস জেল খাটিয়েছে।আমাদের নামে হয়রানিমুলক একাধিক মামলা দিয়েছে জাকির।আমাদের কাউকে বাড়িতে আসতে দিচ্ছে না।মাকেও মামলা দিয়ে বাড়িছাড়া করেছে।মুহুরির প্রভাব দেখিয়ে জাকির বলে,থানা,কোর্ট,পুলিশ, ম্যাজিট্রেট সব আমার কথা শোনে।মামলা কি জিনিস তোদের বুঝাবো।তোরা কিভাবে বাড়িতে থাকস দেখবো আমি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনজীবী সহকারী ক্ষমতাবান মুহুরী জাকির হোসেন জানান,এলাকায় মুহুরী হিসেবে প্রভাব দেখান না।মাকে কারাগারে পাঠানো বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি এড়িয়ে যান।পিতার গায়ে হাত দেন নি বলেও জানান তিনি।এ সময় তার বিষয়ে মায়ের কোনো অভিযোগ নেই বলেন।মা- ভাইবোনদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করে হয়রানী করার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান।
এ বিষয়ে নোয়াখালী আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মোশাররফ হোসেন মাসুদ জানান,সে কার্ডধারী একজন আইনজীবীর সহকারী, মুহুরী। যদি নিজের ক্ষমতা অপব্যবহার করে এমন কাজ প্রমাণ হয় তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি।
নোয়াখালী জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার
আবু তৈয়র মোহাম্মদ আরিফ হোসেন জানান, বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। দায়ের করা মামলাগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। আদালত থেকেও গোয়েন্দা সংস্থাকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।