জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি সই, শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে হাজারো বাংলাদেশি পণ্য
দীর্ঘ আলোচনার পর জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। গত শুক্রবার টোকিওতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও চুক্তিতে সই করেন।
১ হাজার ২৭২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে মোট ২২টি অধ্যায় রয়েছে, যেখানে পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, মেধাস্বত্ব, শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা এবং বিরোধ নিষ্পত্তিসহ নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকার এটিকে শুধু বাণিজ্যিক নয়, বরং দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব শক্তিশালী করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
চুক্তির আওতায় প্রায় ৭ হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্য জাপানের বাজারে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে ১ হাজার ৩৯টি জাপানি পণ্য। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের দাম কমে প্রতিযোগিতায় সুবিধা পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়া, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হালকা প্রকৌশল এবং আইটি খাতে বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে সব পণ্যে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত সুবিধা মিলবে না। কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে ৪ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে শুল্ক কমিয়ে শূন্যে নামানো হবে। ফলে বাস্তব সুফল পেতে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি প্রয়োজন হবে।
চুক্তিতে রুলস অব অরিজিন ও শুল্ক প্রক্রিয়া সহজীকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উভয় দেশ পণ্যের উৎপত্তি যাচাই ও তথ্য বিনিময়ে সহযোগিতা করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে না পারলে এই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
ইপিএতে সেবা ও বিনিয়োগ খাতেও সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা আইনি সুরক্ষা পাবেন এবং বিরোধ হলে আলোচনার মাধ্যমে বা মধ্যস্থতায় নিষ্পত্তির সুযোগ থাকবে। যদিও জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে বড় ধরনের নতুন ছাড় দেওয়া হয়নি, তবে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ডিজিটাল বাণিজ্য, ই-কমার্স, অনলাইন লেনদেন ও ই-চুক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করার পাশাপাশি জাপানের সরকারি কেনাকাটায় বাংলাদেশি কোম্পানির অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চুক্তিতে শ্রমিকের অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। মেধাস্বত্ব সংরক্ষণে কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ৫ থেকে ১০ বছর সময় দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে প্রয়োজনীয় আইন ও নীতি সংস্কার করতে হবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জাপানি পণ্যে শুল্ক কমলে দেশীয় শিল্পে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং আমদানি শুল্ক আয় কমে রাজস্ব চাপে পড়তে পারে। একই সঙ্গে কৃষি ও খাদ্যপণ্যে কঠোর মানদণ্ড পূরণ করাও বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জাপানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে এখনও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাপানে রপ্তানি ছিল ১৪১ কোটি ডলার, বিপরীতে আমদানি হয়েছে ১৮৭ কোটি ডলারের পণ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, এলডিসি উত্তরণের পরিপ্রেক্ষিতে এই ইপিএ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হলেও মান উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নীতিগত সংস্কার ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।