শনিবার , ১৭ অক্টোবর ২০২৬
শনিবার , ১৭ অক্টোবর ২০২৬
হোম › সারা দেশ › গণপিটুনিতে নিহত শামীম ২০১৮ সালে লিখেছিলেন ধর্মীয় বই ‘অন্তর্দৃষ্টি’

গণপিটুনিতে নিহত শামীম ২০১৮ সালে লিখেছিলেন ধর্মীয় বই ‘অন্তর্দৃষ্টি’

favicon
ভোরের আলো ডেস্ক:
গণপিটুনিতে নিহত শামীম ২০১৮ সালে লিখেছিলেন ধর্মীয় বই ‘অন্তর্দৃষ্টি’

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত ওয়াহিদুজ্জামান শামীম ২০১৮ সালে ‘অন্তর্দৃষ্টি’ নামে একটি ধর্মীয় বই লিখেছিলেন। বইটিতে তিনি কোরআন ও হাদিসের শিক্ষা অনুসরণ, ঈমান অটুট রাখা এবং সৎকাজের মাধ্যমে জান্নাত লাভের বিষয়ে আলোচনা করেন।


পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের বরাতে জানা গেছে, শামীম ছিলেন মেধাবী। তিনি নারায়ণগঞ্জের দেলপাড়া ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা থেকে ফাজিল পাস করেন। পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে ডি.এইচ.এম.এস. ডিগ্রি অর্জন করেন।


২০১৮ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘অন্তর্দৃষ্টি’ বইয়ে ঈমানের গুরুত্ব এবং কোরআন-হাদিসের নির্দেশনা মেনে চলার ওপর জোর দেওয়া হয়। লেখায় তিনি সৎকাজকে জান্নাতের পথ এবং অসৎকাজকে জাহান্নামের পথ হিসেবে উল্লেখ করেন। বইয়ের কোনো অংশে ভুল থাকলে পরবর্তী সংস্করণে সংশোধনের জন্য পাঠকদের জানাতেও অনুরোধ করেছিলেন তিনি।


শামীমের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ওঠার পর গত ১৩ অক্টোবর দুই দফায় গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। দেবহাটা উপজেলার বড় শান্তা গ্রামের বাসিন্দা শামীম দুই সন্তানের জনক ছিলেন। তাঁর বড় ছেলের বয়স ১১ বছর এবং ছোট ছেলের বয়স মাত্র আট মাস।


### যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত


শামীমের ছোট ভাই সাগর সানার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১২ অক্টোবর দুপুরে পারিবারিক বিষয় নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে শামীমের ঝগড়া হয়। এ সময় আশপাশের লোকজন সেখানে জড়ো হন। ওই ঘটনার সময় শামীমের কিছু কথাবার্তা অডিওতে ধারণ করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে সেই অডিওকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ তুলে লোকজনকে জড়ো করা হয়।


সাগর সানার অভিযোগ, ওই দিন সন্ধ্যার পর বড় শান্তা বাজারে জামায়াত কার্যালয়ের পাশে লোকজন জড়ো হন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাঁদের বাড়িতে হামলা চালানো হয় এবং ঘরের তালা ভেঙে ফেলা হয়। এ সময় ভয়ে শামীম ঘরের ভেতরে গিয়ে বিষপান করেন বলে দাবি করেন তাঁর ভাই।


### দুই দফায় গণপিটুনি


পরদিন ১৩ অক্টোবর শামীমের বিরুদ্ধে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ তুলে ফজলুল হক আমিনী নামের এক ব্যক্তি ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচার করেন এবং লোকজনকে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


সে সময় শামীম চিকিৎসার জন্য কুলিয়া এলাকার এক গ্রাম্য চিকিৎসকের চেম্বারে ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে লোকজন জড়ো হয়ে অসুস্থ শামীমকে টেনেহিঁচড়ে বের করে মারধর করেন। পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।


রাত ৯টার দিকে শতাধিক উত্তেজিত ব্যক্তি মিছিল নিয়ে হাসপাতালটিতে হামলা চালান বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সেখানে শামীমকে আবারও মারধর করা হয়। পরে পুলিশ তাঁকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠালে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।


শামীমের মৃত্যুর পর ফজলুল হক আমিনী দাবি করেন, শামীম আল্লাহ, রাসুল ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করতেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।


দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এইচএম শাহীন জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই হামলাকারীরা হাসপাতাল ছেড়ে চলে যায়।


ধর্ম অবমাননার অভিযোগের সত্যতা যা-ই হোক, কাউকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা আইনসম্মত নয়। অভিযোগের তদন্ত ও বিচার যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হওয়াই আইনের শাসনের মূলনীতি।