সোমবার , ২৬ অক্টোবর ২০২৬
সোমবার , ২৬ অক্টোবর ২০২৬
হোম › সারা দেশ › পঞ্চগড়ে মাঠে লাউ ২ টাকা, ঢাকায় বিক্রি ৬০ টাকায়

পঞ্চগড়ে মাঠে লাউ ২ টাকা, ঢাকায় বিক্রি ৬০ টাকায়

favicon
ভোরের আলো ডেস্ক:
পঞ্চগড়ে মাঠে লাউ ২ টাকা, ঢাকায় বিক্রি ৬০ টাকায়

পঞ্চগড়ে জমিতে প্রতি পিস লাউ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২ থেকে ৩ টাকায়। অথচ স্থানীয় বাজারে সেই লাউয়ের দাম ২০ থেকে ২৫ টাকা। রাজধানী ঢাকায় পৌঁছানোর পর একটি লাউ বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। উৎপাদন খরচের তুলনায় দাম কম পাওয়ায় লোকসানে পড়েছেন কৃষকেরা। অন্যদিকে, একই সবজি কয়েক গুণ বেশি দামে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।


দেশের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকায় এবার লাউয়ের ভালো ফলন হয়েছে। মাঠজুড়ে গাছে গাছে ঝুলছে সবুজ লাউ। তবে পর্যাপ্ত ফলন হলেও বাজারে দাম না থাকায় হতাশ চাষিরা। মাঝারি আকারের একটি লাউ জমিতে বিক্রি হচ্ছে ২ টাকায়, আর বড় বা ভালো মানের লাউয়ের দাম ৩ টাকা।


এই দরপতনে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন জেলার আটোয়ারী উপজেলার কৃষকেরা। তাঁদের অভিযোগ, লাউ বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তো উঠছেই না, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয় মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেক কৃষক জমিতেই লাউ ফেলে দিচ্ছেন।


এক চাষি বলেন, লাউয়ের দাম এত কম হওয়ার কথা নয়। অথচ এখন প্রতি পিস লাউ মাত্র ২ থেকে ৩ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।


আরেক কৃষক জানান, এক বিঘা জমিতে লাউ চাষ করতে তাঁর প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অথচ এ পর্যন্ত লাউ বিক্রি করে আয় হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার টাকা। ফলে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে তাঁকে।


অন্য এক চাষির ভাষ্য, একই জমিতে ধান চাষ করলে অন্তত ১০ হাজার টাকার মতো আয় করা যেত। কিন্তু লাউ চাষ করে এখন লোকসানে পড়তে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতা না পাওয়ায় জমির লাউ ফেলে দিতে হচ্ছে বলেও জানান কৃষকেরা।


### মাঠ থেকে রাজধানী, দামের ব্যবধান কয়েক গুণ


কৃষকদের কাছ থেকে নামমাত্র দামে লাউ কিনছেন পাইকার ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। এরপর কয়েক দফা হাতবদল হয়ে সেগুলো পৌঁছাচ্ছে স্থানীয় বাজার ও শহরের খুচরা দোকানে। মাঠে আড়াই টাকায় বিক্রি হওয়া একটি লাউ স্থানীয় বাজারে গিয়ে ১৫ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীতে সেই দাম বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়।


বাজারে বেশি দামে লাউ কিনতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ক্রেতারাও। তাঁদের অভিযোগ, কৃষকেরা যেখানে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, সেখানে ভোক্তাদের একই পণ্য কিনতে হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি দামে। মাঝখানের এই বিশাল দামের ব্যবধানের সুফল কারা পাচ্ছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।


তবে আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত লাউয়ের দাম বাড়ার পেছনে পরিবহন, ওঠানো-নামানো ও কয়েক দফা হাতবদলের খরচ রয়েছে। এসব ব্যয় যুক্ত হওয়ায় মাঠের দামের সঙ্গে খুচরা বাজারের দামের বড় পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। তাঁদের দাবি, কম দামে লাউ কিনেও এবার ব্যবসায় লাভ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।


### বাজার তদারকি ও বিপণনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চগড়ে প্রতিবছর গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ হেক্টর জমিতে লাউয়ের আবাদ হয়। তবে উৎপাদন ভালো হওয়ার পরও কৃষকেরা কেন ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাজার তদারকিতে জনবল ও প্রয়োজনীয় সহায়তার সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।


জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল মতিন বলেন, কৃষকেরা সরাসরি বাজারে এসে পণ্য বিক্রি করতে পারলে অনেকাংশে ন্যায্যমূল্য পাবেন। এবার একসঙ্গে অনেক কৃষক লাউ চাষ করেছেন এবং একই সময়ে বাজারে প্রচুর সবজি এসেছে। কয়েক দিনের মধ্যে সরবরাহ কমে এলে কৃষকেরা তুলনামূলক বেশি দামে লাউ বিক্রি করতে পারবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।


অন্যদিকে, পঞ্চগড়ের কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মুয়ালেনা খানম জানান, তাঁদের দপ্তরে জনবল ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে দ্রুত এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।


কৃষকের উৎপাদিত পণ্য মাঠে বিক্রি হচ্ছে নামমাত্র দামে, অথচ একই পণ্য কিনতে গিয়ে ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি অর্থ। এই ব্যবধান কমিয়ে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরাসরি বিপণনব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন পঞ্চগড়ের প্রান্তিক কৃষকেরা।