দাঁতের ক্ষয় সারাতে নতুন প্রযুক্তি, পরীক্ষাগারে মিলেছে আশাব্যঞ্জক ফল
দাঁতের ক্ষয়প্রাপ্ত অংশ মেরামত এবং হারিয়ে যাওয়া এনামেল পুনর্গঠনের সম্ভাবনা তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা। এ লক্ষ্যে প্রোটিনভিত্তিক বিশেষ এক ধরনের জেল তৈরি করেছেন তাঁরা। গবেষকদের দাবি, নতুন এই জেল দাঁতের ক্ষতিগ্রস্ত এনামেলের গঠন ও বৈশিষ্ট্য পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে দাঁতের ক্ষয় রোধেও এটি কার্যকর হতে পারে।
এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এই জেল তৈরি করেছেন। গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার কমিউনিকেশনস’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, জেলটি দাঁতের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে প্রয়োগ করলে সেখানে নতুন খনিজ কণা সুসংগঠিতভাবে তৈরি হতে সাহায্য করে। এর ফলে দাঁতের হারানো এনামেলের মতো একটি কাঠামো পুনর্গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে গবেষণাটি এখনো পরীক্ষাগার পর্যায়ে রয়েছে। মানুষের ওপর এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।
দাঁতের এনামেল কেন গুরুত্বপূর্ণ
এনামেল হলো দাঁতের সবচেয়ে শক্ত বাইরের আবরণ। এটি দাঁতের ভেতরের সংবেদনশীল অংশকে চিবানোর চাপ, অ্যাসিড, ব্যাকটেরিয়া এবং তাপমাত্রার পরিবর্তন থেকে সুরক্ষা দেয়।
তবে হাড়ের মতো এনামেলে জীবন্ত কোষ থাকে না। ফলে একবার উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ক্ষয় হয়ে গেলে এটি স্বাভাবিকভাবে পুনরায় তৈরি হতে পারে না।
খাবার ও পানীয়ের অ্যাসিড, মুখের ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্রম, দাঁত ঘষার অভ্যাস এবং স্বাভাবিক ক্ষয়প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে এনামেল নষ্ট হতে পারে। বর্তমানে ফ্লুরাইডযুক্ত পণ্য, ফিলিং ও ক্রাউনের মাধ্যমে দাঁতের ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ এবং মেরামত করা হয়। কিন্তু এসব চিকিৎসায় দাঁতের মূল এনামেলের প্রাকৃতিক গঠন ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না।
যেভাবে কাজ করবে নতুন জেল
বিজ্ঞানীদের তৈরি নতুন জেলটি ইলাস্টিন-লাইক রিকম্বিনামার বা ইএলআর নামের প্রোটিনভিত্তিক উপাদান দিয়ে তৈরি। দাঁতের এনামেল গঠনে প্রাকৃতিকভাবে কাজ করা উপাদানের অনুরূপ বৈশিষ্ট্য তৈরি করেই এটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দাঁতের ক্ষতিগ্রস্ত পৃষ্ঠে জেলটি প্রয়োগ করলে সেখানে একটি পাতলা আবরণ তৈরি হয়। এই আবরণ কাঠামো হিসেবে কাজ করে এবং লালারস থেকে ক্যালসিয়াম ও ফসফেটের মতো খনিজ উপাদান সংগ্রহ করে নতুন স্ফটিক তৈরিতে সহায়তা করে। এই প্রক্রিয়াকে এপিট্যাক্সিয়াল মিনারেলাইজেশন বলা হয়।
নতুন তৈরি হওয়া স্ফটিকগুলো বিদ্যমান এনামেলের কাঠামো অনুসরণ করে সুসংগঠিতভাবে বৃদ্ধি পায়। দাঁতের শক্তি শুধু খনিজ উপাদানের ওপর নির্ভর করে না, বরং এসব স্ফটিকের সুশৃঙ্খল বিন্যাসও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধে কতটা কার্যকর হবে
গবেষকদের ধারণা, নতুন এই প্রযুক্তি দুর্বল ও ক্ষয়প্রাপ্ত এনামেল পুনর্গঠনের মাধ্যমে দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে। দাঁতের সুরক্ষামূলক আবরণ শক্তিশালী করা গেলে ক্ষয় আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকিও কমতে পারে।
তবে এখনই এই জেলকে দাঁতের চিকিৎসায় ব্যবহারযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। গবেষণাটি মূলত পরীক্ষাগারে দাঁতের নমুনার ওপর পরিচালিত হয়েছে। মানুষের দাঁতে এর কার্যকারিতা, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে দাঁতের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও আপাতত এটি পরীক্ষামূলক পর্যায়েই রয়েছে।