শনিবার , ০৭ নভেম্বর ২০২৬
শনিবার , ০৭ নভেম্বর ২০২৬
হোম › বিশ্ব › ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিয়েই মার্কিন সিনেটে জয়ী আবদুল এল-সায়েদ

ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিয়েই মার্কিন সিনেটে জয়ী আবদুল এল-সায়েদ

favicon
ভোরের আলো ডেস্ক:
ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিয়েই মার্কিন সিনেটে জয়ী আবদুল এল-সায়েদ

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে সোচ্চার অবস্থান নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ। ইসরাইলের দখলদারত্ব ও নীতির সমালোচনা করে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো এই প্রার্থীর বিজয় দেশটির রাজনীতিতে ফিলিস্তিন ইস্যুর গুরুত্ব নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।


গত ৩ নভেম্বর মিশিগানে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৫২ শতাংশ ভোট পেয়ে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেন এল-সায়েদ। রজার্স পেয়েছেন ৪৬ শতাংশ ভোট।


এই জয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম মুসলিম-আমেরিকান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার ইতিহাস গড়েছেন তিনি। পাশাপাশি তিনি দেশটির সিনেটে নির্বাচিত ষষ্ঠ আরব-আমেরিকান।


এল-সায়েদের বিজয়কে ডেমোক্র্যাটদের সাম্প্রতিক নির্বাচনী সাফল্যের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওই নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণও পেয়েছে দলটি।


ইসরাইল ইস্যুতে অবস্থান নিয়ে বিতর্ক


নির্বাচনী প্রচারণার পুরো সময় ইসরাইলের অস্তিত্বের অধিকার স্বীকার করেন কি না, এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে এল-সায়েদকে। তবে তিনি এ ধরনের প্রশ্নের যৌক্তিকতা নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তোলেন। তার বক্তব্য, রাজনীতিবিদদের কখনো ফিলিস্তিনের অস্তিত্বের অধিকার কিংবা ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে একইভাবে প্রশ্ন করা হয় না।


তিনি ফিলিস্তিনিদের নিজেদের মাতৃভূমিতে স্বাধীনতা, সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাসের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।


গত সেপ্টেম্বরে মিশিগানের একদল রাব্বি, ক্যান্টর ও ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতা ‘নননেগোশিয়েবল মিশিগান’ নামে একটি প্রচারাভিযান শুরু করেন। জিওনেস অ্যাকশন ফান্ডের সমর্থনে পরিচালিত এ উদ্যোগে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও নেতাদের কাছে পাঁচটি নীতিগত বিষয়ে অঙ্গীকার চাওয়া হয়। এর মধ্যে ইহুদিদের নিরাপত্তা, পরিচয় নির্ধারণের অধিকার এবং ইসরায়েলে ইহুদিদের সার্বভৌমত্বের বিষয়ও ছিল।


তবে সমালোচকদের মতে, এই প্রচারাভিযানের মাধ্যমে ইসরাইলকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অবস্থানকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম শর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছিল।


এল-সায়েদ অবশ্য ইহুদি নাগরিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও রাজনৈতিক অধিকারকে সমর্থন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ইসরাইলের নীতির সমালোচনাকে ইহুদিবিদ্বেষের সঙ্গে এক করে দেখার বিরোধিতা করেছেন তিনি।


মুসলিম ও আরববিদ্বেষী প্রচারণার অভিযোগ


নির্বাচনী প্রচারণায় এল-সায়েদের আরব ও মুসলিম পরিচয় নিয়েও নানা বিতর্ক তৈরি হয়। তার বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহ, হামাস ও মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ তোলা হয়। এমনকি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার প্রতি তার সমর্থন রয়েছে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়।


এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে শরিয়াহ আইন চালুর চেষ্টা করবেন—এমন অভিযোগও প্রচারণায় সামনে আসে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণের উল্লেখ করা হয়নি।


এল-সায়েদ ও তার সমর্থকদের বারবার তার মার্কিন পরিচয় তুলে ধরতে হয়েছে। তিনি মিশিগানে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং অন্য মার্কিন নাগরিকদের মতোই দেশের রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার অধিকার রাখেন বলে প্রচারণায় উল্লেখ করা হয়।


প্রগতিশীল রাজনীতির জন্য নতুন বার্তা


নির্বাচনে জয়ের পর এল-সায়েদ বলেন, ‘খারাপ লোকেরাই হেরেছে।’ তার এই মন্তব্যকে নির্বাচনী প্রচারণায় ভয় ও বিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে ভোটারদের অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন সমর্থকেরা।


তার বিজয় ডেমোক্র্যাট দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে প্রগতিশীল অবস্থান নিয়ে দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনে জয় পাওয়া সম্ভব নয়—দলটির প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের এমন ধারণা নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।


এল-সায়েদের বিরুদ্ধে দলীয় প্রাইমারিতে অন্যতম যুক্তি ছিল, মিশিগানের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে তার প্রগতিশীল অবস্থান সাধারণ নির্বাচনে জয়ের পথে বাধা হতে পারে। কিন্তু চূড়ান্ত নির্বাচনে তার জয় সেই আশঙ্কার বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছে।


২০২৪ সালের নির্বাচনের প্রসঙ্গ


যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও এ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিং এবং ইউগভের পরিচালিত একটি জনমত জরিপে ইসরাইলে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সম্ভাব্য নির্বাচনী প্রভাব তুলে ধরা হয়েছিল।


জরিপে বলা হয়, এ ধরনের অবস্থান নিলে কমলা হ্যারিস যত ভোট হারাতে পারেন, তার তুলনায় পাঁচ থেকে সাত গুণ বেশি ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে ডেমোক্র্যাট নেতৃত্ব সে সময় বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


বিশ্লেষকদের মতে, এল-সায়েদের বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ফিলিস্তিন ইস্যু, মুসলিম-আরব ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্ব নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। তবে এই জয় দেশটির নীতিনির্ধারণে কতটা পরিবর্তন আনবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতে তার রাজনৈতিক ভূমিকা ও দলীয় অবস্থানের ওপর।


সূত্র: মিডল ইস্ট আই।