ঝিনাইদহ কারাগার ‘নির্যাতনের কেন্দ্র’: বন্দিদের ওপর অমানবিক আচরণের অভিযোগ
ঝিনাইদহ জেলা কারাগার শাস্তি ভোগের জায়গা হলেও এখন তা পরিণত হয়েছে এক ‘ভয়ংকর নির্যাতন সেলে’। অভিযোগ উঠেছে, সেখানে বন্দিদের নিয়মিতভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে। এসব তথ্য পাওয়া গেছে বন্দি, তাদের স্বজন, সদ্য জামিন পাওয়া ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার এবং মানবাধিকারকর্মীদের বক্তব্য থেকে।
সূত্র জানায়, বন্দিদের জন্য বরাদ্দ খাবার পর্যাপ্ত নয় এবং মানসম্মতও নয়। অনেক সময় পচা ডাল, বাসি ভাত বা দুর্গন্ধযুক্ত তরকারি দেওয়া হয়। যেসব বন্দি অতিরিক্ত টাকা খরচ করেন, তারা ভালো খাবার ও সুবিধা পান; কিন্তু গরিব বন্দিদের কপালে জোটে অনাহার আর দুর্ভোগ।
সদ্য জামিন পাওয়া কয়েকজন বন্দি জানিয়েছেন, সেলের ভেতরে নিয়মিতভাবে নির্যাতন চলে। সামান্য নিয়মভঙ্গ বা কারা কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করলেই লাঠি, পাইপ কিংবা বৈদ্যুতিক তার দিয়ে মারধর করা হয়। অনেকে নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়লেও সঠিক চিকিৎসা পান না।
বন্দিদের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, কারাগারে দেখা করতে গেলে তাদের নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেক সময় সাক্ষাতের সুযোগ পেতে কারারক্ষীদের ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ না দিলে সাক্ষাতের অনুমতি মেলে না, আর পেলেও তা কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেষ করে দেওয়া হয়।
চিকিৎসাসেবার অভাবও কারাগারে মারাত্মক রূপ নিয়েছে। সেখানে কোনো পূর্ণকালীন চিকিৎসক নেই, ফলে অনেক বন্দি সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
সূত্র আরও জানায়, কারাগারে ‘সিট বাণিজ্য’ চলে প্রকাশ্যে। ভালো জায়গায় থাকার জন্য বন্দিদের দিতে হয় হাজার হাজার টাকা। যারা টাকা দিতে পারেন না, তাদের রাখা হয় দুর্গন্ধযুক্ত মেঝেতে। এমনকি ব্লক বরাদ্দও মাসিক চুক্তিতে হয়, যা কারারক্ষীদের একটি চক্র পরিচালনা করে।
মানবাধিকারকর্মী আব্দুর রহমান বলেন, “কারাগারে বন্দিদের সংশোধনের পরিবর্তে তাদের ওপর অমানবিক আচরণ চালানো হচ্ছে, যা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। এই নির্যাতন বন্দিদের মানসিকভাবে আরও বিপর্যস্ত করে তুলছে।”
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কারাগারে বন্দিদের মানবাধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। নির্যাতনের মাধ্যমে নয়, বরং পুনর্বাসন ও শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে বন্দিদের সংশোধনের সুযোগ তৈরি করা উচিত।
ঝিনাইদহের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জাকারিয়া মিলন বলেন, “বন্দিদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আগের সরকারের আমলেও এমন অভিযোগ উঠেছিল। বর্তমান সরকারের আমলেও যদি এসব ঘটতে থাকে, তবে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক।”
সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত বলেন, “বন্দিদের সংশোধনের জায়গা যদি নির্যাতনের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তবে তা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, সমাজের জন্যও ভয়াবহ বার্তা দেয়। কারাগারের ভেতরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরিদর্শন ও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।”
অভিযোগ অস্বীকার করে ঝিনাইদহ জেলা কারাগারের জেল সুপার হাবিবুর রহমান বলেন, “আমি সদ্য যোগদান করেছি। কারাগারের মান উন্নয়নে কাজ করছি। যদি এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকে, তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।