জোড়াতালির ওপর দাঁড়িয়ে ঝালকাঠির বাসন্ডা সেতু: ৯ বছর ধরে অতি ঝুঁকিপূর্ণ, তবুও চলছে যান চলাচল
ঝালকাঠির বাসন্ডা সেতুটি এখন দাঁড়িয়ে আছে যেন লোহার সেলাই করা এক বিশাল জোড়াতালির পাটাতন। বছরের পর বছর ধরে অস্থায়ী মেরামতের নামে একটার পর একটা লোহার পাত বসানো হয়েছে। ১২০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই বেইলি সেতুর পাটাতনে এখন হাজারের বেশি জোড়াতালি। যতটুকু সংস্কার হয়, তার কোনোই স্থায়ী ফল পাওয়া যায় না। ফলে সেতুটি যেভাবে কাঁপে, নদীর পানি কেঁপে ওঠে, আশপাশের মানুষের বুক দুরুদুরু করে—কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, সড়ক বিভাগ যেন এই বিপদের প্রতিক্রিয়াহীনই রয়ে গেছে।
নিয়মিত মেরামতে বিগত কয়েক বছরে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে—যে অর্থে নতুন একটি সেতু সহজেই তৈরি করা যেত। তারপরও বরিশাল–খুলনা মহাসড়কের এই গুরুত্বপূর্ণ সেতুটি অপসারণ বা পুনর্নির্মাণে কোনো উদ্যোগ নেই। তাই প্রতিদিন হাজারো মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে রেখেই যানবাহন চলাচল করছে।
গত শতাব্দির আশির দশকে চাঁদকাঠী এলাকায় নির্মিত এই বেইলি সেতুটি অস্থায়ী কাঠামো হিসেবেই তৈরি হয়েছিল এবং বহু আগেই এর কার্যক্ষমতার সময়সীমা পার হয়ে গেছে। সেতুটির ধারণক্ষমতা মাত্র সাত টন হলেও প্রতিদিন তিন থেকে চার গুণ বেশি ওজনের যানবাহন এর ওপর দিয়ে ছুটে চলে। পদ্মা সেতু ও বেকুটিয়া সেতু চালুর পর এই চাপ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবার কোনো ভারী বাস বা ট্রাক উঠলে সেতুটি দুলে ওঠে, আর পাটাতনের প্লেটে তীব্র শব্দে কেঁপে উঠে যেন ভেঙে পড়ার আগাম সংকেত দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, প্রতিবছরই মেরামতের নামে শুধু জোড়াতালির সংখ্যা বেড়েছে। একটি লোহার পাত বদলালে কয়েক মাসের মধ্যেই সেটি আবার নড়বড়ে হয়ে পড়ে। সেতুটির ১৯৮৯ সালের নকশা অনুযায়ী এটি ৩৯৪ ফুট লম্বা, ২৫ ফুট চওড়া হলেও এখন এর পাটাতনে জোড়াতালির সংখ্যা ছয় শতাধিক ছাড়িয়েছে। ২০১৬ সালে একে আনুষ্ঠানিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। এরপর প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ঝালাই ও পাটাতন বদলানো হলেও সেতুর স্থায়িত্ব বাড়েনি।
সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহারিয়ার শরীফ খান জানিয়েছেন, নতুন কংক্রিট সেতু নির্মাণের নকশা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন মিললেই নতুন সেতুর কাজ শুরু হবে।
এ সেতুর নিচেই বাস করেন হাবিব শিকদার। নির্মাণকালে তিনি শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছিলেন ও তখন থেকেই সেখানেই তাঁর সংসার। তিনি জানান, প্রথমদিকে সেতুর নিচে বড় লোহার প্লেট থাকলেও সময়ের সঙ্গে মরিচা ধরে নাটুবোল্ট ক্ষয়ে গেছে। পরে ছোট প্লেট বসানো হয়। এখন শুধুই প্লেট আর জোড়াতালির স্তূপ। তিনি বলেন, একবার নড়বড়ে পাটাতন ভেঙে একটি গাড়ি নিচে পড়ে যায়। স্থানীয় এক দরবেশের অন্তঃসত্ত্বা মেয়েও নিচে পড়ে আহত হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান।
হাবিবের মেয়ে কলি বেগম বলেন, আগে সেতুর নিচে তাঁদের খাবারের হোটেল চালু ছিল, কিন্তু সেতুর তীব্র শব্দ ও নড়বড়ে অবস্থার কারণে এখন আর ক্রেতা আসে না। তাই পাশের দোকান ভাড়া নিয়ে খাবার পরিবেশন করা হয়। রাতটা কাটে সেতুর নিচের ঘরেই। ভয় থাকলেও ভাড়া না লাগায় ঝুঁকি নিয়েই থাকতে হচ্ছে।
সেতুর নিচেই রয়েছে বায়তুল রোদোয়ান জামাতে মসজিদ। প্রায় ১৯ বছর ধরে ইমামতি করা মাওলানা আবুল বাশার জানান, আগের মতো শান্ত পরিবেশ আর নেই। প্রায় দশ বছর ধরে সেতুর শব্দ এত বেড়েছে যে নামাজ পড়াতে মাইক ছাড়া উপায় থাকে না। কখনো বিদ্যুৎ চলে গেলে মুসল্লিরা ইমামের কথা শুনতে না পেরে ইশারায় নামাজ সম্পন্ন করতে হয়। মসজিদটিও সেতুর নড়বড়ে অবস্থার কারণে একটি পাশে হেলে পড়েছে, কিন্তু সেতুর সংস্কার না হওয়ায় নতুন করে নির্মাণের কাজও এগোতে পারছে না।
বাসন্ডা সেতুর এই নড়বড়ে অবস্থায় প্রতিদিনই বাড়ছে ঝুঁকি, বাড়ছে মানুষের ভয়ের মাত্রা। বছরের পর বছর চলা জোড়াতালি ও অস্থায়ী মেরামত আর কতদিন এই সেতুকে টিকিয়ে রাখবে—এই প্রশ্ন এখন এলাকাবাসীর মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।