টাকার অবমূল্যায়নে আমদানি চাপে: রমজানে নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত ডলার ও শুল্ক ছাড়ের সুপারিশ
ডলারের বিপরীতে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়নের ফলে আমদানিকারকদের সক্ষমতা কমে গেছে। একই সঙ্গে গ্রাহকের এলসির বিপরীতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর একক ঋণসীমা (সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লিমিট) না বাড়ায় প্রয়োজনীয় পরিমাণ পণ্য আমদানিতে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানিকারকদের জন্য অতিরিক্ত ডলার সরবরাহের সুপারিশ করা হয়েছে।
সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা রমজানকেন্দ্রিক বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে চাল, ডাল, গম, পিঁয়াজ, ভোজ্য তেল, চিনি, ছোলা, মটর, খেজুর ও মসলাজাতীয় পণ্যের আমদানিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন শুল্ক ও কর কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শীতকালে জ্বালানির চাহিদা বাড়ায় মিল ও কারখানাগুলোতে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিতে পারে, যা উৎপাদন ব্যাহত করে রমজানে পণ্যের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি করতে পারে। এ কারণে শিল্পকারখানায় ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার সুপারিশও করা হয়েছে।
গত নভেম্বরে প্রণীত এই প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এতে রমজানে নিত্যপণ্যের দাম ও সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে মোট ১০টি সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ভোজ্য তেল, চিনি ও খেজুরের মতো আমদানিনির্ভর পণ্যের এলসি খোলার পর থেকে দেশে পৌঁছাতে গড়ে তিন মাস সময় লাগে। ফলে আগেভাগেই প্রয়োজনীয় ডলার সংস্থান ও একক ঋণসীমা বাড়ানো জরুরি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সুপারিশ পাঠানোর কথাও বলা হয়েছে।
একটি ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানান, ২০২২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় একক গ্রাহক ঋণসীমা সংশ্লিষ্ট মূলধনের ২৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ করা হয়, যার মধ্যে ফান্ডেড ঋণ সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ। সে সময় ডলারের দাম ছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা। বর্তমানে ডলারপ্রতি মূল্য ১২০ টাকার বেশি হওয়ায় একই ঋণসীমায় আগের তুলনায় অনেক কম পণ্য আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে। এতে বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থার সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—আমদানিনির্ভর পণ্যে ভ্যাট ও উৎসে কর যৌক্তিক পর্যায়ে সমন্বয়, বন্দরে পাইপলাইনে থাকা পণ্য দ্রুত খালাস, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয়ে পণ্য পরিবহন নির্বিঘ্ন রাখা, মিলগেট থেকে প্রকৃত মূল্যে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা, অবৈধ মজুত ও কৃত্রিম সংকট রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও বাজার মনিটরিং জোরদার করা এবং টিসিবি, ওএমএসসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ।
এ ছাড়া রমজানের শুরুতে ‘প্যানিক বায়িং’ ঠেকাতে গণমাধ্যমে ইতিবাচক প্রচারণা চালানো এবং দুধ, ডিম ও মাংসসহ প্রাণিজ খাদ্য সুলভমূল্যে বিক্রির কার্যক্রম জেলা পর্যায়েও সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে রমজানকেন্দ্রিক পণ্যের আমদানি কিছুটা বেড়েছে এবং এলসির জন্য ডলারের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। এরই মধ্যে খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমানো হয়েছে। মুড়িকাটা পিঁয়াজ বাজারে আসায় দামও কমতে শুরু করেছে। এ ছাড়া বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য ১৯ জানুয়ারি টাস্কফোর্সের বৈঠক ডাকা হয়েছে।