আদানির বিদ্যুৎসহ বিদ্যুৎকেন্দ্র চুক্তিতে গুরুতর অনিয়মের তথ্য, বাতিলের সুযোগ দেখছে জাতীয় কমিটি
আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিগত সরকারের আমলে করা বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি ও চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। জাতীয় কমিটির চার সদস্যের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এমন ধারণা পাওয়া গেছে। ভারতের ঝাড়খণ্ডে নির্মিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে ‘বাতিলযোগ্য অনিয়ম’ রয়েছে বলে মনে করছেন কমিটির সদস্যরা। তাঁদের মতে, এসব অনিয়মের প্রমাণ উপস্থাপন করে আদালতের মাধ্যমে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আদানির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
যদিও জাতীয় কমিটির চার সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। জানা গেছে, জাতীয় কমিটি মঙ্গলবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। একই সঙ্গে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে করা চুক্তির অনিয়ম তুলে ধরে একটি পৃথক প্রতিবেদনও দাখিল করা হয়। তবে এসব প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করেনি বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, জাতীয় কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠানো হবে। এরপর সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন–২০১০-এর আওতায় করা চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর এই জাতীয় কমিটি গঠন করে। পরে ওই বছরের নভেম্বরে বিশেষ আইনটি রহিত করা হয়। কমিটির প্রতিবেদনে বিশেষ আইনের অধীনে সম্পাদিত বিদ্যুৎকেন্দ্র চুক্তি ও চুক্তির আগের পুরো প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
কমিটির সদস্যদের মতে, বিগত সরকারের সময় বিশেষ ক্ষমতা আইনের অপব্যবহার করে একের পর এক একতরফা চুক্তি করা হয়েছে, যেখানে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি চুক্তি আরেকটির প্রতিলিপি হিসেবে করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোর সম্পৃক্ততার কথাও উঠে এসেছে।
কমিটির একটি সূত্র জানায়, শুধু চুক্তি নয়, চুক্তির আগের পুরো প্রক্রিয়া যাচাই করে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপের নমুনা পাওয়া গেছে। সাবেক দুই বিদ্যুৎ সচিব আবুল কালাম আজাদ ও আহমদ কায়কাউসের নামও সংঘবদ্ধ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হিসেবে প্রতিবেদনে এসেছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী। অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বুয়েটের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, কেপিএমজি বাংলাদেশের সাবেক সিওও আলী আশফাক, বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক।
কমিটির সুপারিশে ভবিষ্যতে এ ধরনের চুক্তি এড়াতে স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে যাচাই-বাছাইয়ের কথা বলা হয়েছে। এ পর্যালোচনার ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২১ জানুয়ারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্যারিফ পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়, যার কাজ এখনো চলমান।
চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে নেয় এবং ইউনিটপ্রতি দাম নির্ধারিত হয় চুক্তিতে উল্লেখিত সূত্র অনুযায়ী। তবে অভিযোগ রয়েছে, সমঝোতার মাধ্যমে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে এবং দরপত্র ছাড়াই বিশেষ বিধান আইনের সুযোগ নিয়ে এসব চুক্তি করা হয়েছে।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন