সমস্যায় জর্জরিত বেসরকারি খাত, জরুরি সমাধান উদ্যোগের দাবি
মামলা-হামলা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, জ্বালানি সংকট এবং উচ্চ সুদের হারের চাপে দেশের বেসরকারি খাত চরম সংকটে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হয়রানি ও তথাকথিত মিডিয়া ট্রায়ালের ফলে সৃষ্ট আস্থার সংকট। উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মতে, পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসই যেখানে ব্যবসার মূল ভিত্তি, সেখানে এই আস্থাহীনতা পুরো অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, সরকারি নানা ধরনের চাপ ও হয়রানির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এর ফলে শুধু ব্যক্তিগত ব্যবসাই নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক উদ্যোক্তার ভাষ্য, বর্তমানে দেশে ব্যবসা করাই যেন অপরাধে পরিণত হয়েছে।
শিল্পকারখানা মালিকদের মতে, ব্যবসাবাণিজ্যের পরিবেশ এখন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রতিকূল। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই, ব্যাংক ঋণের সুদহার বেড়ে প্রায় ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে এবং মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলা কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও শ্রম আইন সংস্কার নিয়ে শঙ্কাও বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ তো হচ্ছেই না, বরং বিদ্যমান বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এর প্রভাব হিসেবে কারখানা বন্ধ হওয়া ও ব্যাপক কর্মসংস্থান হ্রাসের চিত্র দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে আমদানি দায় নিষ্পত্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪.৮৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ শতাংশ কম। এর প্রধান কারণ মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়া, যা ইঙ্গিত দেয় শিল্প সম্প্রসারণ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। যদিও নতুন এলসি খোলা কিছুটা বেড়েছে, তা মূলত ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির চাহিদা হ্রাস পাচ্ছে। উচ্চ সুদহার ও ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহকে আরও দুর্বল করছে। পাঁচ মাস পর আবারও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক পর্যায়ে নেমেছে, যা শিল্প ও ব্যবসাবাণিজ্যের মন্দাভাবকে স্পষ্ট করছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৫ সালের বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিবেশ প্রতিবেদনে অবকাঠামোর ঘাটতি, সীমিত অর্থায়ন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বৈষম্যমূলক করব্যবস্থা ও দুর্নীতিকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়েছে এবং বিনিয়োগ ও রপ্তানি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বেসরকারি খাতের আস্থা পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত এবং ব্যাংক ও জ্বালানি খাতে সংস্কার ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক গতি ফেরানো কঠিন হবে। এজন্য দ্রুত ও সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।