মঙ্গলবার , ২৮ জুলাই ২০২৬
মঙ্গলবার , ২৮ জুলাই ২০২৬
হোমবিশ্বঅনলাইনে বিদ্বেষ ছড়িয়ে মালয়েশিয়ায় বন্ধ হচ্ছে রোহিঙ্গা স্কুল, শিক্ষাবঞ্চিত হাজারো শিশু

অনলাইনে বিদ্বেষ ছড়িয়ে মালয়েশিয়ায় বন্ধ হচ্ছে রোহিঙ্গা স্কুল, শিক্ষাবঞ্চিত হাজারো শিশু

favicon
ভোরের আলো ডেস্ক:
অনলাইনে বিদ্বেষ ছড়িয়ে মালয়েশিয়ায় বন্ধ হচ্ছে রোহিঙ্গা স্কুল, শিক্ষাবঞ্চিত হাজারো শিশু

মালয়েশিয়ায় অনলাইনে রোহিঙ্গাবিরোধী ঘৃণামূলক প্রচারণা বাড়তে থাকায় শরণার্থী শিশুদের জন্য পরিচালিত একের পর এক শিক্ষা কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে হাজারো রোহিঙ্গা শিশু শিক্ষার সুযোগ হারানোর পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতা ও মানসিক চাপে ভুগছে।


রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১২ বছর বয়সী রোহিঙ্গা শিশু নুর গত জুন মাস থেকে স্কুলে যেতে পারছে না। স্কুলে যাওয়ার পথে দুই ব্যক্তি তাকে হুমকি দেওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তার কারণে তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেন। নুরের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।


অধিকারকর্মী ও শিক্ষকদের দাবি, নুরের মতো আরও অনেক রোহিঙ্গা শিশু ভয়ভীতি ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। ফলে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত নয়টি শরণার্থী শিক্ষা কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে।


রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী শারিফা শাকিরাহ বলেন, এই পরিস্থিতিতে অনেক শিশু ঘরের বাইরে বের হতেও ভয় পাচ্ছে। তার মতে, এমন ভয় শিশুদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাব ফেলতে পারে এবং তাদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।


রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য, বিদ্বেষমূলক প্রচারণা এবং উসকানিমূলক পোস্ট ছড়িয়ে পড়ার পর তাদের ওপর প্রশাসনিক নজরদারি ও অভিযানও বেড়েছে। তবে এ বিষয়ে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করেনি।


মালয়েশিয়া সরকার রোহিঙ্গাদের আনুষ্ঠানিকভাবে শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না; তাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গা বসবাস করছেন।


করোনা মহামারির সময় থেকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা বাড়তে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, থ্রেডস ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে আবারও রোহিঙ্গাবিরোধী কনটেন্ট ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি তাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়ার দাবিতে একটি অনলাইন আবেদনেও প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ স্বাক্ষর করেছিলেন, যদিও পরে সেটি সরিয়ে নেওয়া হয়।


মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা **আর্টিকেল ১৯** বলেছে, অনলাইনের বিদ্বেষমূলক প্রচারণা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ঘটনা বাড়িয়েছে। সংস্থাটির মতে, শাস্তিমূলক পদক্ষেপের পরিবর্তে মানবাধিকারভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন।


অন্যদিকে ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, রোহিঙ্গা ও অন্যান্য শরণার্থীদের বিরুদ্ধে অনলাইনে ঘৃণামূলক বক্তব্য ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় তারা উদ্বিগ্ন এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।


মালয়েশিয়ার আইন অনুযায়ী শরণার্থীদের সরকারি স্কুলে পড়ার সুযোগ নেই। ফলে তারা মূলত বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত শিক্ষা কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের কারণে এসব কেন্দ্রও একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে চালু থাকা কয়েকটি স্কুলও শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম পরা ও বাইরের কার্যক্রম বন্ধসহ অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।


অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হলে রোহিঙ্গা শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রম, ভিক্ষাবৃত্তি ও বাল্যবিয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হতাশ নুর রয়টার্সকে বলেছে, "আমি যদি স্কুলে যেতে না পারি, তাহলে কিছুই শিখতে পারব না, আর জীবনে কিছুই হতে পারব না।"