যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও ট্রাম্পকে চাপে ফেলতে পারে কানাডা
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হলেও শুল্কযুদ্ধের পাল্টা জবাব দিতে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে কানাডা। মার্কিন পণ্যে ‘ডলারের বিনিময়ে ডলার’ ভিত্তিতে পাল্টা শুল্ক আরোপের পাশাপাশি জ্বালানি, খনিজ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতকে কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটনের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল নিচ্ছে কানাডার সরকার।
যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৪৫টির প্রধান তিন বাণিজ্যিক অংশীদারের একটি কানাডা। ফলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হলে মার্কিন অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কানাডার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে দেশটির জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি করা প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের বড় অংশ এবং প্রায় ৬০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল কানাডা থেকে যায়। ফলে কানাডা জ্বালানি সরবরাহে কড়াকড়ি আরোপ করলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
যদিও জ্বালানি খাতকে এখনো সরাসরি পাল্টা শুল্কের আওতায় রাখা হয়নি, তবে কানাডার প্রাদেশিক নেতারা এ সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ রপ্তানির ওপর ২৫ শতাংশ সারচার্জ আরোপের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এটি কার্যকর হলে মিশিগান, মিনেসোটা ও নিউইয়র্কের প্রায় ১৫ লাখ বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এর প্রভাব পড়তে পারে।
ডাগ ফোর্ড বলেন, কানাডাকে অবমূল্যায়ন করা যুক্তরাষ্ট্রের বড় ভুল। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রয়োজনে জ্বালানি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যকে পাল্টা চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান পটাশ সরবরাহকারী দেশ কানাডা। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ি ও আধুনিক প্রযুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ লিথিয়াম, নিকেল ও গ্রাফাইটের বড় মজুদ রয়েছে দেশটিতে। এসব খনিজের বড় বাজারও যুক্তরাষ্ট্র। ফলে সরবরাহে বাধা তৈরি হলে মার্কিন শিল্প ও কৃষি খাতে চাপ বাড়তে পারে।
এর পাশাপাশি মার্কিন পণ্যের ওপর ভোক্তা পর্যায়েও চাপ তৈরি করছে কানাডা। দেশটির ১৩টি প্রদেশের মধ্যে ১১টি সরকারি মদের দোকান থেকে মার্কিন মদ ও স্পিরিট বিক্রি বন্ধ করেছে। এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইন ও স্পিরিট শিল্পে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় মার্কিন ওয়াইন রপ্তানি ৭৮ শতাংশ এবং স্পিরিট রপ্তানি ৭০ শতাংশের বেশি কমেছে। এতে মার্কিন পানীয় শিল্পের ক্ষতির পরিমাণ ৩৫৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু বাণিজ্য নয়, কানাডীয়দের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ কমে যাওয়াও মার্কিন অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮ লাখ কম কানাডীয় যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করেন। ভ্রমণ কমে যাওয়ায় মার্কিন পর্যটন খাত গত এক বছরে প্রায় ২ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব হারিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এই বাণিজ্যযুদ্ধে কানাডারও অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ৫০ শতাংশ মার্কিন শুল্কের কারণে স্বল্পমেয়াদে কানাডার জিডিপি ০ দশমিক ৩ থেকে ০ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তারপরও সরকারের কঠোর অবস্থানকে কানাডীয়দের বড় অংশ সমর্থন করছে।
এই বাণিজ্য সংঘাতের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও পড়তে পারে। ইয়েল বাজেট ল্যাবের হিসাব অনুযায়ী, শুল্কের কারণে একটি মার্কিন পরিবারের বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার ১০০ ডলার খরচ হতে পারে।
এ ছাড়া কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ির অন্যতম বড় বাজার হওয়ায় শুল্ক বাড়লে মিশিগান, ওহাইও, কেন্টাকি ও আলাবামার মতো অঙ্গরাজ্যের গাড়ি শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে রপ্তানি কমে গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ফলে বাণিজ্যযুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কানাডার পাল্টা পদক্ষেপ শুধু অর্থনীতিতেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনেও চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে শুল্কের কারণে ভোক্তা ব্যয়, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়লে তা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।