ব্যাংক লুটের মহোৎসব: আড়াই লাখ কোটি টাকা উধাও, রক্ষকরাই ভক্ষক
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতির নজিরবিহীন চিত্র ফুটে উঠেছে—যেখানে রক্ষকের ভূমিকায় থাকা অনেক পরিচালকই হয়ে উঠেছেন ভয়ংকর লুটেরা। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের মালিক ও পরিচালকরা নামে-বেনামে, জাল কাগজে এবং ভূয়া প্রতিষ্ঠানের আড়ালে লোপাট করেছেন প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। ব্যাংকের টাকায় গড়ে তুলেছেন বিদেশে বাড়ি-গাড়ি, আর দেশজুড়ে গ্রাহকরা রাস্তায় নেমেছেন নিজের জমানো টাকার জন্য।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব পরিচালক ব্যাংকিং খাতকে পরিণত করেছেন ব্যক্তিগত অর্থ আত্মসাতের প্ল্যাটফর্মে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পরিচালকদের নামে ২০১৬ সালে যেখানে ঋণ ছিল ৯০ হাজার কোটি টাকা, তা ২০২3 সালের আগস্টে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা, যা ৮ বছরে ১৬০% বৃদ্ধি পেয়েছে।
নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সীমা থাকলেও একে অপরের ব্যাংকের মাধ্যমে যোগসাজশ করে কয়েকশো পরিচালক মিলে লুটপাট করেছেন বিশাল অঙ্কের ঋণ। কেউ কেউ নিজেদের ড্রাইভার বা আত্মীয়দের নামেও প্রতিষ্ঠানের মালিকানা দেখিয়ে নিয়েছেন ঋণ। সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক (২৭ হাজার কোটি), পূবালী ব্যাংক (১৭ হাজার কোটি), জনতা ব্যাংক (১৩.৫ হাজার কোটি) এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (১০ হাজার কোটি)।
তদন্তে উঠে এসেছে, এ লুটের নায়করা এখনো অনেকাংশে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। কেউ কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন, যেমন এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো, ও আরামিট গ্রুপের পরিচালকরা। শিকদার গ্রুপের রন হক ও রিক হক-এর বিরুদ্ধে ৪৬৯ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলা করেছে দুদক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব অর্থ আদায় এখন প্রায় অসম্ভব। জামানতগুলোর বাজারমূল্য প্রায়শই ঋণের ১০% পর্যন্তও পৌঁছায় না। সিএসপিএস নির্বাহী পরিচালক ড. মিজানুর রহমান মনে করেন, এদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করতে হবে।
বর্তমানে সৎ উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তাদের উপর চাপানো হচ্ছে উচ্চ সুদের বোঝা। অথচ কিছু অসৎ পরিচালক ব্যাংকের বিশাল অর্থ বিদেশে পাচার করে নিচ্ছেন এবং থেকে যাচ্ছেন আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং খাতের এই ভয়াবহ দুর্নীতি রুখতে আইনি কাঠামো সংস্কার, কঠোর নজরদারি এবং দুর্নীতিবাজদের দ্রুত বিচার অপরিহার্য। না হলে এই খাতের ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা পুরোপুরি উঠে যাবে।