বৃহস্পতিবার , ০৮ অক্টোবর ২০২৬
বৃহস্পতিবার , ০৮ অক্টোবর ২০২৬
হোম › বিশ্ব › ক্ষমতাবান নেতা হওয়ার আগে অনেক কিছু হারিয়েছিলেন শি জিনপিং

ক্ষমতাবান নেতা হওয়ার আগে অনেক কিছু হারিয়েছিলেন শি জিনপিং

favicon
ভোরের আলো ডেস্ক:
ক্ষমতাবান নেতা হওয়ার আগে অনেক কিছু হারিয়েছিলেন শি জিনপিং

চীনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রায় ১৪ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন শি জিনপিং। দীর্ঘ এই সময়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ও বিশ্ব রাজনীতিতে দেশটির অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তবে চীনের অন্যতম ক্ষমতাবান নেতা হয়ে ওঠার পথটি শি জিনপিংয়ের জন্য মোটেও সহজ ছিল না।


১৯৫৩ সালে বেইজিংয়ে জন্ম নেওয়া শি জিনপিং ছিলেন চীনের প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা শি ঝংজুন ছিলেন চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবের অন্যতম নেতা এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। একসময় শি জিনপিংকে রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে বিশেষ সুবিধা পাওয়া ‘রাজপুত্র’দের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হতো।


তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁর পরিবারের সেই সুবিধা হারিয়ে যায়। ১৯৬০-এর দশকের গোড়ায় শি ঝংজুনের বিরুদ্ধে দলবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। তাঁকে গ্রামাঞ্চলের একটি কারখানায় কাজ করতে পাঠানো হয় এবং পরে কমিউনিস্ট পার্টি থেকেও বহিষ্কার করা হয়।


বাবার রাজনৈতিক পতনের প্রভাব পড়ে কিশোর শি জিনপিংয়ের জীবনেও। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তাঁকে চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শানসি প্রদেশের লিয়াংজিয়াহে গ্রামে পাঠানো হয়। সেখানে প্রায় সাত বছর একটি গুহাবাড়িতে বসবাস করেন তিনি। কৃষিকাজের পাশাপাশি সার বহন, নালা খননসহ নানা ধরনের কঠিন শ্রম করতে হয়েছে তাঁকে।


পরে শি জিনপিং এক সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেছিলেন, ট্রেনের সবাই কাঁদছিল, কিন্তু তিনিই একমাত্র হাসছিলেন।


গ্রামের কঠিন জীবন তাঁর ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। ক্ষুধা ও উকুনের মতো সমস্যার মধ্যেও ধীরে ধীরে তিনি ওই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেন। স্থানীয় খাবারের অভ্যাসও তাঁর জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।


রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন


২২ বছর বয়সে গ্রাম ছাড়েন শি জিনপিং। এরপর তিনি চিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে রাসায়নিক প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করেন। পড়াশোনা শেষে ফুজিয়ান ও ঝেজিয়াং প্রদেশে স্থানীয় কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।


চীনের অর্থনীতি উন্মুক্ত হওয়ার পর উপকূলীয় এ দুই প্রদেশ দ্রুত অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। এ সময় দলের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে ধীরে ধীরে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করেন শি।


এরই মধ্যে তাঁর বাবা রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হন। বাবার পুরোনো রাজনৈতিক যোগাযোগও শি জিনপিংয়ের উত্থানে ভূমিকা রাখে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।


ব্যক্তিজীবনেও এ সময় পরিবর্তন আসে। ১৯৭৯ সালে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত সাবেক এক চীনা রাষ্ট্রদূতের মেয়ে কে লিংলিংকে বিয়ে করেন তিনি। তবে তিন বছর পর তাদের বিচ্ছেদ হয়। পরে সামরিক বাহিনীর পরিচিত লোকসংগীত শিল্পী পেং লিউয়ানকে বিয়ে করেন শি। তাদের একমাত্র সন্তান শি মিংজের জন্ম ১৯৯২ সালে।


সর্বোচ্চ ক্ষমতার পথে


২০০৭ সালে সাংহাইয়ের শীর্ষ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর স্থায়ী কমিটিতে জায়গা করে নেন শি জিনপিং। এর পাঁচ বছর পর, ২০১২ সালে হু জিনতাওয়ের স্থলাভিষিক্ত হয়ে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন। পরের বছর চীনের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন।


ক্ষমতায় আসার পর দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন শি। তাঁর নেতৃত্বে চীন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা জোরদার হয়।


একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে চীনের প্রতিযোগিতা বাড়ে। দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ানকে ঘিরে উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।


দেশের অভ্যন্তরে শি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। শিনজিয়াং, তিব্বত ও হংকংয়ে তাঁর সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপকে সমর্থকেরা স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হিসেবে দেখলেও সমালোচকেরা নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।


শি জিনপিংয়ের নামে ‘নতুন যুগের জন্য চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতন্ত্র বিষয়ে শি জিনপিংয়ের চিন্তাধারা’ নামে একটি রাজনৈতিক মতাদর্শও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০১৮ সালে চীনের সংবিধান সংশোধন করে প্রেসিডেন্টের দুই মেয়াদের সীমা তুলে দেওয়া হয়। এতে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার সুযোগ তৈরি হয় তাঁর জন্য।


বন্ধু নাকি প্রতিদ্বন্দ্বী


রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে শি জিনপিংয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। শি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দুই নেতার মধ্যে বহুবার বৈঠক হয়েছে এবং পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার হয়েছে।


অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হলেও বিভিন্ন সময়ে ট্রাম্প শি জিনপিংয়ের প্রশংসা করেছেন এবং তাঁকে বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেছেন।


ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও শি শুরুতে ব্যক্তিগত কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তবে ২০২০ সালে ভারত-চীন সীমান্তে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।


কিশোর বয়সে রাজনৈতিক পরিবারের সুযোগ-সুবিধা হারিয়ে গ্রামীণ জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া শি জিনপিং পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে চীনের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছান। সেই পথ পেরিয়ে তিনি আজ চীনের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের একজন।