পরিচয় চুরি করে যুক্তরাষ্ট্রের ছাত্র সহায়তার অর্থ আত্মসাৎ, অভিযুক্ত কেনীয় নাগরিক
অন্যের পরিচয় চুরি করে ভুয়া শিক্ষার্থী তৈরির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ছাত্র সহায়তার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে কেনিয়ার নাগরিক ফ্রান্সিস মোগাম্বির বিরুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ‘অপারেশন ঘোস্টবাস্টার্স’ নামের বৃহত্তর জালিয়াতিবিরোধী তদন্তের অংশ হিসেবে তার বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ চুরি ও পরিচয় চুরির অভিযোগ আনা হয়েছে।
তদন্তকারীদের দাবি, এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনায় প্রায় ১৩ কোটি মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি শনাক্ত করা হয়েছে। তবে এই অর্থের পুরোটা যে আত্মসাৎ করা হয়েছে, তা নিশ্চিত করেনি কর্তৃপক্ষ। বিবিসির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মে মাসে ডাইভারসিটি ভিসা লটারির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে যান মোগাম্বি। ২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর নেব্রাস্কার একটি গ্র্যান্ড জুরি তার বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ চুরির পাঁচটি এবং পরিচয় চুরির পাঁচটি অভিযোগে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি হেফাজতে রয়েছেন। তবে অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।
### যেভাবে চলত জালিয়াতি
মার্কিন প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মোগাম্বি কেনিয়ায় অবস্থানরত সহযোগীদের সঙ্গে মিলে মার্কিন নাগরিকদের ব্যক্তিগত পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য চুরি করেন। এসব তথ্য ব্যবহার করে এমন ভুয়া শিক্ষার্থী তৈরি করা হতো, যারা বাস্তবে কোনো কলেজে পড়াশোনা করতেন না।
পরে এসব ভুয়া শিক্ষার্থীর নামে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কলেজে ভর্তি এবং ফেডারেল আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করা হতো। সহায়তার অর্থ পাওয়ার পর মোগাম্বি তার ৩০ শতাংশ নিজের কাছে রেখে বাকি অর্থ কেনিয়ায় থাকা সহযোগীদের পাঠিয়ে দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মামলার নথিতে তার বিরুদ্ধে প্রায় ২০ হাজার ডলারের সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। আদালতের নথি অনুযায়ী, এই কাজের বিনিময়ে তিনি সপ্তাহে প্রায় দুই হাজার ডলার পেতেন। পাশাপাশি তিনি আরও একজনকে এই কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
### ভুয়া শিক্ষার্থীকে সক্রিয় রাখার কৌশল
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চক্রের সদস্যরা চুরি করা ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে ভুয়া শিক্ষার্থীদের পরিচয় তৈরি করতেন। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথাকথিত ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ ব্যবহার করে এসব শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ সময় কলেজে সক্রিয় রাখার চেষ্টা করা হতো।
তদন্তকারীদের ধারণা, এর উদ্দেশ্য ছিল ভুয়া শিক্ষার্থীদের একের পর এক সেমিস্টারে ভর্তি দেখিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে তাদের নামে সরকারি আর্থিক সহায়তার অর্থ নেওয়া।
মার্কিন বিচার বিভাগের জাতীয় জালিয়াতি প্রতিরোধ বিভাগের প্রধান ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল কলিন এম. ম্যাকডোনাল্ড জানিয়েছেন, ছাত্র সহায়তা কর্মসূচির অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
### ১৩ কোটি ডলারের সম্ভাব্য জালিয়াতি শনাক্ত
তদন্তকারীরা ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে প্রায় ১৩ কোটি ডলারের সঙ্গে সম্পর্কিত ৮ লাখ ৩০ হাজার ৮৪০টি সম্ভাব্য জাল ফেডারেল ছাত্র সহায়তার আবেদন বা হিসাব শনাক্ত করেছেন। এসব হিসাব নিষ্ক্রিয় করার জন্য শিক্ষা বিভাগকে সুপারিশ করা হয়েছে। তবে শনাক্ত করা অর্থের পুরোটাই আত্মসাৎ হয়েছে, এমন দাবি করেনি কর্তৃপক্ষ।
এই জালিয়াতির ফলে শুধু মার্কিন সরকারের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাই তৈরি হয়নি, পরিচয় চুরির শিকার সাধারণ নাগরিকেরাও ঝুঁকিতে পড়েছেন। তাদের নামে ছাত্রঋণ বা অন্যান্য আর্থিক দায় তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে তাদের ঋণসংক্রান্ত আর্থিক ইতিহাস।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ২০২৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার কমিউনিটি কলেজগুলোতে আবেদনকারীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশকে সম্ভাব্য প্রতারক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল।
### যুক্তরাষ্ট্র- কেনিয়া আর্থিক যোগসূত্রের সন্ধান
‘অপারেশন ঘোস্টবাস্টার্স’ তদন্তে যুক্তরাষ্ট্র ও কেনিয়ার মধ্যে কথিত আর্থিক যোগসূত্রও উঠে এসেছে। গত সেপ্টেম্বরে মার্কিন কর্মকর্তারা কেনিয়ায় গিয়ে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কাজ করেন।
কেনীয় তদন্তকারীদের সহায়তায় এই চক্রের সঙ্গে জড়িত এক কেনীয় নাগরিকের ক্রিপ্টোকারেন্সি হিসাব থেকে সাত লাখ ৫০ হাজার ডলারের বেশি অর্থ জব্দ করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, কেনিয়ায় এ ধরনের প্রথম আন্তর্জাতিক অর্থ জব্দের ঘটনা এটি। তবে জব্দ করা অর্থ মোগাম্বির মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
এ ছাড়া ভার্জিনিয়ার একটি পৃথক মামলায় এক কেনীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে ৭০০টির বেশি ভুয়া ছাত্র সহায়তার অর্থ গ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ ডলার। এর মধ্যে অন্তত ১৩ লাখ ডলার যুক্তরাষ্ট্র ও কেনিয়ার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিউ জার্সিতেও তিনজনের বিরুদ্ধে ১০ লাখ ডলারের বেশি ফেডারেল ছাত্র সহায়তা আত্মসাতের ঘটনায় অর্থ পাচারে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রসিকিউটরদের দাবি, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক হিসাবে আসা অর্থের একটি অংশ নিজেদের কাছে রেখে বাকিটা কেনিয়ায় থাকা সহযোগীদের কাছে পাঠাতেন।
মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত এই তদন্তে কেনিয়ার নাগরিকদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আরও ৪০টি তদন্ত চলমান রয়েছে।
### দোষী সাব্যস্ত হলে হতে পারে দীর্ঘ কারাদণ্ড
ফ্রান্সিস মোগাম্বি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে তার অন্তত ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া দোষীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশও দিতে পারেন আদালত।
তবে মোগাম্বির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে অভিযুক্ত হিসেবেই বিবেচনা করা হবে।