রাজনীতির দুষ্টচক্র থেকে মুক্ত করতে হবে অর্থনীতি: নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা
জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশজুড়ে প্রচার-প্রচারণা তুঙ্গে। প্রার্থীরা জনগণের কাছে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তবে সাধারণ মানুষের মূল প্রশ্ন—নির্বাচিত সরকারের কাছে তারা আসলে কী প্রত্যাশা করেন? রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এই প্রশ্নের বাস্তবসম্মত উত্তর খোঁজা।
একটি দেশের মূল চালিকাশক্তি হলো অর্থনীতি। শক্তিশালী অর্থনীতি ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং মানুষের ন্যূনতম জীবনমান নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব। একজন নাগরিক তার আয়ের মাধ্যমে পরিবার নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারলেই প্রকৃত অর্থে উন্নয়ন অর্থবহ হয়।
কিন্তু অতীতের সরকারগুলো জনগণের এই মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ জমেছে। এবারের নির্বাচন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তাই নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। এসব প্রত্যাশা পূরণে সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীল করা।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানে কেবল বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প নয় কিংবা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা কিছু মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনও নয়। প্রকৃত উন্নয়ন মানে দেশের সব শ্রেণির মানুষের জীবনমানের উন্নতি। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের শক্তিশালী ভূমিকা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, জনবান্ধব নীতি ও জবাবদিহিতা অপরিহার্য।
সমালোচকদের মতে, গত দেড় দশকে দেশের অর্থনীতি দুর্নীতি ও লুটপাটের সংস্কৃতিতে জর্জরিত ছিল। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ইচ্ছামতো ঋণ নেওয়া, অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচারের অভিযোগ ওঠে। বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামোসহ নানা খাতে লুটপাটের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শনে বাধ্য করা হতো, অন্যথায় ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ত।
এর ফলে কালো অর্থনীতির বিস্তার ঘটে, বাড়ে অবৈধ ব্যবসা ও চোরাচালান। প্রশাসনে জবাবদিহিতার ঘাটতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দুর্নীতি আরও গভীর হয়। এসবের বিরুদ্ধে জনরোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে।
আওয়ামী লীগের পতনের পর জনগণ পরিবর্তনের আশা করেছিল। কিন্তু গত ১৭ মাসে অর্থনীতি প্রত্যাশিত পথে এগোয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার কিছু সংস্কারমূলক উদ্যোগ নিলেও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে পারেনি। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে।
এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, চাঁদাবাজি ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এতে বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে এবং লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়েছে।
বেসরকারি খাতের আস্থা সংকটে পড়ায় রপ্তানি ও নতুন বিনিয়োগ কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে বিদেশি বিনিয়োগের ওপরও। বর্তমানে অর্থনীতির বড় ভরসা হয়ে আছে প্রবাসী আয়। তবে জনশক্তি রপ্তানিতেও নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে। দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। অভিযোগ আছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন করে বিপুল সংখ্যক জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, ফলে এই খাতও আবার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে বিশেষজ্ঞদের মত, নতুন নির্বাচিত সরকারকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করে অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের দিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। না হলে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা সম্ভব হবে না।