একদিনে টনপ্রতি ১০ হাজার টাকা বেড়েছে রডের দাম, প্রশ্নে বাজার
দেশের বাজারে হঠাৎ করেই বেড়েছে নির্মাণসামগ্রীর অন্যতম প্রধান উপকরণ রডের দাম। এর ফলে আবাসন ও অবকাঠামো খাতের ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে দাম বাড়তে থাকলে নির্মাণ খাতের গতি কমে যেতে পারে এবং সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, ইরান যুদ্ধের অজুহাতে কিছু ব্যবসায়ী যোগসাজশের মাধ্যমে রডের দাম বাড়িয়েছেন। গতকাল সোমবার এক দিনেই রডের দাম টনপ্রতি প্রায় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। তবে পুনরায় গলিয়ে ইস্পাত তৈরির কারখানার মালিকেরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের যোগসাজশের সুযোগ নেই। তাদের মতে, যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনে জাহাজ চলাচলে জটিলতা তৈরি হয়েছে এবং কাঁচামালের দাম ১৩০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে। এর প্রভাব স্থানীয় বাজারেও পড়ছে।
সরকারি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি খাত সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। তবুও জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে সরকার দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি। তাই তুলনামূলক কম প্রভাব পড়ার পরও রডের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।
বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন এবং জনস্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিছুদিন আগেও যে রডের দাম ছিল টনপ্রতি ৭৫ থেকে ৮০ হাজার টাকা, তা গতকাল বেড়ে ৯০ থেকে ৯১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। বাজারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রডের দামও বেড়েছে। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানের রড টনপ্রতি ৮৪ হাজার টাকা, আরেকটির ৯০ হাজার টাকা, অন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের রড ৯১ হাজার টাকা এবং একটি প্রতিষ্ঠানের রড প্রায় ৮৭ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে লোহার ভাঙারি বা স্ক্র্যাপের দাম বাড়ছে। পাশাপাশি কয়লা ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কারণে সিমেন্ট উৎপাদনের ব্যয়ও বেড়েছে। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলারের দাম বাড়ায় আমদানিনির্ভর শিল্পগুলো অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়েছে। ফলে নির্মাণসামগ্রীর উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রডের দাম বাড়ার পেছনে স্থানীয় কারখানার মালিকদের দায়ী করা হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি ব্যয়, পণ্য পরিবহন ব্যয় এবং কাঁচামালের দামের চাপ মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এতে ভবিষ্যতে দেশের নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে ধীরগতি দেখা দিতে পারে।
আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠনের এক শীর্ষ নেতা লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে থাকা আবাসন খাতে হঠাৎ রডের দাম বেড়ে যাওয়ার যৌক্তিক কারণ দেখা যাচ্ছে না। তার মতে, বাজারে কোনো ধরনের কারসাজি আছে কি না তা খতিয়ে দেখা দরকার। তিনি বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর নজরদারি করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনীতিতে আবাসন খাতের বড় ভূমিকা রয়েছে। এই খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক সরাসরি কাজ করেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ এক কোটির বেশি মানুষের জীবিকা এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। রডের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে শ্রমিক ও উদ্যোক্তা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
অন্যদিকে একটি ইস্পাত প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মো. সাইফুর রহমান খোকন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের ইস্পাত শিল্প মন্দার মধ্যে রয়েছে। নির্বাচনের পর ব্যবসায়ীরা বাজার ভালো হওয়ার আশা করেছিলেন।
ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকি নিতে না চাওয়ায় জাহাজভাড়া বেড়েছে। ফলে কাঁচামাল আমদানির খরচও বাড়ছে।
তার মতে, পুরো পরিস্থিতি বিশ্ববাজারের সঙ্গে জড়িত। তাই বিষয়টি নিয়ে সরকারকে নজরদারি বাড়াতে হবে এবং সঠিক তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।