ভারত-জাপান উন্নয়ন উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ, আঞ্চলিক করিডরে নতুন সম্ভাবনা
ভারত ও জাপানের যৌথ উন্নয়ন সহযোগিতা উদ্যোগে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে তিন দেশের অর্থনৈতিক সংযোগ, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।
গত ২ জুলাই অনুষ্ঠিত ১৬তম ভারত-জাপান বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ ঘোষণায় এ বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্যের কথা জানানো হয়। ঘোষণায় উত্তর-পূর্ব ভারতের উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ এবং সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) শক্তিশালী করতে বাংলাদেশসহ বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জাপানের ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ এবং ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির আওতায় উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে শিল্প, বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হবে। এ লক্ষ্যে বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
যদিও ঘোষণায় নির্দিষ্ট কোনো প্রকল্পের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, উত্তর-পূর্ব ভারতের উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে বাংলাদেশের সড়ক, রেল ও সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
এর আগে ২০২৩ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশকে সংযুক্ত করে শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নের একটি বৃহৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেই পরিকল্পনাকে আরও বিস্তৃত করে পুরো বিমসটেক অঞ্চলে সংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি জানান, উত্তর-পূর্ব ভারতের উন্নয়ন জাপানের সঙ্গে সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এ অঞ্চলে চলমান অংশীদারত্ব ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত হবে এবং এ বিষয়কে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়বে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর, সড়ক ও রেল করিডর, সীমান্তভিত্তিক বাণিজ্য, লজিস্টিকস এবং আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ আঞ্চলিক উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, জাপানের ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলে বাংলাদেশ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং মিয়ানমার গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত অঞ্চল। তিনি মনে করেন, এ উদ্যোগ শুধু উত্তর-পূর্ব ভারত নয়, মিয়ানমারের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংযোগও জোরদার করতে পারলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ আরও বেশি সুরক্ষিত হবে।
তার মতে, ভারত, জাপান ও বাংলাদেশের যৌথ শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়ন তিন দেশের জন্যই পারস্পরিক লাভজনক (উইন-উইন) পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তাই ভবিষ্যতে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।