বৃহস্পতিবার , ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বৃহস্পতিবার , ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হোমজাতীয়বাজারে মিলছে না অত্যাবশ্যকীয় ১১৭ ওষুধের বেশিরভাগ

বাজারে মিলছে না অত্যাবশ্যকীয় ১১৭ ওষুধের বেশিরভাগ

favicon
ভোরের আলো ডেস্ক:
বাজারে মিলছে না অত্যাবশ্যকীয় ১১৭ ওষুধের বেশিরভাগ

অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে তালিকাভুক্ত ১১৭টি ওষুধের বেশিরভাগই বর্তমানে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রযুক্তির পরিবর্তনে কিছু ওষুধের চাহিদা কমে যাওয়া, কাঁচামালের সংকট এবং উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বাজারমূল্যের সামঞ্জস্য না থাকায় কয়েকটি ওষুধের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে গিয়ে বাড়তি খরচের চাপে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।


রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রিকশাচালক আমির আলী প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী কয়েকটি ওষুধ বিনামূল্যে পেলেও ব্যথার ওষুধ পাননি। তাকে বাইরে থেকে দুটি ওষুধ কিনতে হবে। তার ভাষ্য, আগের তুলনায় বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে এখন অনেক বেশি টাকা খরচ হচ্ছে।


একই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা গাড়িচালক মেহেদী কোনো ওষুধই বিনামূল্যে পাননি। বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা খরচ হতে পারে—এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।


১৯৯৪ সালে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ওষুধের দাম রাখার লক্ষ্যে ১১৭টি ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করে সরকার। তবে সময়ের সঙ্গে ওষুধ উৎপাদন প্রযুক্তিতে পরিবর্তন এসেছে এবং বাজারে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন নতুন ধরনের ওষুধ। ফলে তালিকাভুক্ত কিছু ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও ব্যথানাশক ওষুধের চাহিদা ও সরবরাহ কমে গেছে।


রাজধানীর এক ওষুধ ব্যবসায়ী জানান, তালিকাভুক্ত বেশ কয়েকটি ওষুধ এখন আর নিয়মিত পাওয়া যায় না। কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে কাঁচামালের সংকটের কথা জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।


অন্যদিকে, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও দীর্ঘদিন ধরে কিছু ওষুধের দাম হালনাগাদ না করায় কোম্পানিগুলো লোকসানের মুখে পড়ছে। ফলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পুরোনো প্রয়োজনীয় ওষুধ উৎপাদনে আগ্রহ কমেছে। এর পরিবর্তে তুলনামূলক বেশি দামের নতুন ওষুধ বাজারে আসছে।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল বলেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রতি দুই বছর পরপর ওষুধের দাম সমন্বয়ের কথা থাকলেও দীর্ঘদিন তা করা হয়নি। এতে উৎপাদন ব্যয় ও নির্ধারিত দামের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। ফলে কোম্পানিগুলো পুরোনো ওষুধের পাশাপাশি বেশি দামের নতুন ওষুধ বাজারজাত করছে।


জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোশতাক হোসেনের মতে, ১৯৯৪ সালের তালিকায় থাকা কিছু ওষুধ তৈরির প্রযুক্তি এখন অনেকটাই পুরোনো। বর্তমানে আরও আধুনিক ওষুধ বাজারে এসেছে। পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনব্যবস্থার কারণে কিছু ওষুধের উৎপাদন ব্যয়ও কমেছে। তাই সব ওষুধের দাম একইভাবে বিবেচনা না করে বর্তমান উৎপাদন ব্যয় ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নীতিমতে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকা উচিত। সংস্থাটির তালিকায় ৫০০টির বেশি ওষুধকে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ২৯৫টি ওষুধের দাম নির্ধারণের উদ্যোগ নিলেও পরে বিএনপি সরকার সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে।


অধ্যাপক শিমুল বলেন, বাংলাদেশে মানুষের আয় ও চিকিৎসা ব্যয়ের বাস্তবতা বিবেচনায় ওষুধের দাম সাশ্রয়ী রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে দাম অতিরিক্ত কমিয়ে দিলে কোম্পানিগুলো উৎপাদনে আগ্রহ হারাতে পারে। এতে বাজারে ওষুধের সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ওষুধের দাম নির্ধারণে উৎপাদন ব্যয় ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে।


ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, একজন মানুষের নিজের পকেট থেকে চিকিৎসায় যে ব্যয় হয়, তার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই ওষুধ কেনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় চলে যায়। এ ব্যয় কমাতে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।


তিনি আরও বলেন, মেধাস্বত্ব আইন কার্যকর হওয়ার পরও ওষুধ কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত মুনাফার লক্ষ্যে দাম বাড়ালে সাধারণ মানুষের ওপর চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ আরও বাড়বে।


সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের মানুষের গড় আয় ৩০ হাজার টাকার বেশি হলেও এ হিসাব নিম্নআয়ের বড় জনগোষ্ঠীর প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা তুলে ধরে না। তাই সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা, উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাজারে কার্যকর তদারকি জোরদার করা জরুরি।