ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞায় ক্ষুব্ধ ইসরায়েল, জেরুজালেমে কনস্যুলেট বন্ধের ঘোষণা
অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার পাল্টা জবাব হিসেবে জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। একই সঙ্গে সাবেক লেবার নেতা জেরেমি করবিনসহ কয়েকজন ব্রিটিশ এমপির ইসরায়েলে প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সা’র জানিয়েছেন, অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের শেখ জাররাহ এলাকায় অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়া হবে। কনস্যুলেটটি গাজা, পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমসহ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করে। তবে ইসরায়েলে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের কার্যালয় তেল আবিবে অবস্থিত।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংস কর্মকাণ্ডকে ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে বর্ণনা করার পর ইসরায়েল এ পাল্টা পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়। মিলিব্যান্ডের অভিযোগ, এসব সহিংস কর্মকাণ্ডে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের নীরব সমর্থন রয়েছে।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সা’র দাবি করেন, ব্রিটেনের পদক্ষেপ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ’। তাঁর ভাষায়, ইসরায়েলের ব্রিটিশ জনগণের বিরুদ্ধে কোনো বিরোধ নেই; তবে বর্তমান ব্রিটিশ সরকার ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘শত্রুভাবাপন্ন’ পদক্ষেপ নিচ্ছে।
**যেসব ব্রিটিশ এমপির ওপর নিষেধাজ্ঞা**
ইসরায়েল বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ এমপির দেশটিতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক লেবার নেতা জেরেমি করবিন, ইউর পার্টির এমপি জারা সুলতানা, লেবার এমপি ডায়ান অ্যাবট, নাজ শাহ, জন ম্যাকডোনেল ও রিচার্ড বার্গন। এছাড়া গ্রিন পার্টির এমপি হান্নাহ স্পেন্সার, কার্লা ডেনিয়ার, সিয়ান বেরি ও এলি চাউনসও এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন।
এ ছাড়া পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ব্রিটেনের দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা বন্ধের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে ইসরায়েল। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন গাজা সমন্বয় মিশন থেকেও যুক্তরাজ্যকে বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
**১২ দেশের নিষেধাজ্ঞা**
অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে যুক্তরাজ্য যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তা ফ্রান্স ও কানাডাসহ আরও ১১টি দেশের সঙ্গে সমন্বিতভাবে ঘোষণা করা হয়েছে।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই পদক্ষেপকে ‘নৈতিকভাবে বিকৃত’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের শামিল।
তবে ব্রিটিশ এমপিদের ওপর প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। তিনি এ সিদ্ধান্তকে ‘গুরুতর ভুল’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, নিষেধাজ্ঞা কোনো সমাধান নয়; বরং সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা উচিত।
**পশ্চিম তীরে বসতি নিয়ে বিরোধ**
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে। নেতানিয়াহু সরকারের কট্টর ডানপন্থী কয়েকজন মন্ত্রী প্রকাশ্যেই দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধিতা করে বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে প্রতীকী পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে দক্ষিণ আটলান্টিকে অবস্থিত ব্রিটিশ ভূখণ্ড ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনার দাবিকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানান।
**যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান**
ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞাকে ‘ইহুদি জনগণের বিরুদ্ধে বৈষম্য’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন। তাঁর সতর্কবার্তা, এ পদক্ষেপের জন্য যুক্তরাজ্যকে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা ব্যবস্থা বা প্রতিশোধের মুখে পড়তে হতে পারে।
তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তুলনামূলক সংযত অবস্থান নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার মতো নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথে যাবে না যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরকে আরও অস্থিতিশীল করতে পারে—এমন পদক্ষেপও ওয়াশিংটন দেখতে চায় না।
**যুক্তরাজ্যের নীতিতে পরিবর্তন**
ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে যুক্তরাজ্যের পরপর কনজারভেটিভ ও লেবার সরকার দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলকে সতর্ক করে আসছে। এর আগে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা ও পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনের অভিযোগে কয়েকজন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও অবৈধ বসতির ওপর নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছিল ব্রিটেন।
তবে সম্প্রতি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড আরও কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য এখন শুধু ইসরায়েলি বসতিগুলো নয়, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখলকেও অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করে।
ব্রিটেনের এ অবস্থান লেবার দলের অনেক ভোটার ও আইনপ্রণেতার সমর্থন পেতে পারে। তাঁরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি আরও জোরালো সমর্থনের দাবি জানিয়ে আসছেন।
ফলে বসতি সম্প্রসারণ ও পশ্চিম তীরের দখল নিয়ে দুই দেশের অবস্থান যত কঠোর হচ্ছে, ততই ইসরায়েল-যুক্তরাজ্য সম্পর্কের কূটনৈতিক দূরত্ব বাড়ছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান