শুক্রবার , ২৬ জুন ২০২৬
শুক্রবার , ২৬ জুন ২০২৬
হোমজাতীয়নতুন দুই মেট্রো লাইনে ব্যয় ১.৮৪ লাখ কোটি টাকা, সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় সরকার

নতুন দুই মেট্রো লাইনে ব্যয় ১.৮৪ লাখ কোটি টাকা, সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় সরকার

favicon
ভোরের আলো ডেস্ক:
নতুন দুই মেট্রো লাইনে ব্যয় ১.৮৪ লাখ কোটি টাকা, সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় সরকার

রাজধানীতে নতুন দুটি মেট্রো রেলপথ নির্মাণে ব্যয় আগের উত্তরা–মতিঝিল লাইনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হতে যাচ্ছে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রো রেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছিল ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। অথচ নতুন দুই লাইনে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। ঠিকাদারদের প্রস্তাব অনুযায়ী দুটি প্রকল্প মিলিয়ে মোট ব্যয় হতে পারে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।


এই বিপুল ব্যয় প্রকল্প দুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। ফলে বিষয়টি এখন নির্বাচিত সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।


নির্মাণের অপেক্ষায় থাকা দুটি লাইনের একটি এমআরটি লাইন-১, যা কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর এবং নর্দ্দা হয়ে পূর্বাচল পর্যন্ত বিস্তৃত, যার দৈর্ঘ্য ৩১ কিলোমিটারের বেশি। অন্যটি এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর), যা সাভারের হেমায়েতপুর থেকে মিরপুর ও গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ। দুটি লাইনেরই কিছু অংশ উড়ালপথে এবং কিছু অংশ পাতালপথে নির্মিত হওয়ার কথা।


বিশ্লেষকদের মতে, দরপত্রে প্রতিযোগিতা সীমিত থাকাই ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার অন্যতম কারণ। বর্তমানে প্রতিযোগিতা মূলত জাপানি ঠিকাদারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ জানিয়েছেন, প্রকল্প দুটি জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার ঋণে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং জাইকার আরোপিত কিছু প্রকৌশলগত শর্তের কারণে ঠিকাদার নিয়োগে প্রতিযোগিতা কমে গেছে। ফলে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।


উত্তরা–মতিঝিল লাইনের সম্প্রসারিত অংশ কমলাপুর পর্যন্ত যাবে। পুরো লাইনের দৈর্ঘ্য ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার এবং এতে ব্যয় হচ্ছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের কাজ এখনো চলমান।


লাইন-১ প্রকল্পটি ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে অনুমোদিত হয়। তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। কিন্তু ১২টি প্যাকেজের মধ্যে ৮টির দর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গড় হিসাবে ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। একইভাবে ২০১৯ সালের অক্টোবরে অনুমোদিত লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। তবে পাঁচটি প্যাকেজের দর বিশ্লেষণে সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮৮ হাজার কোটি টাকা।


দুটি প্রকল্প মিলিয়ে আগে অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৯৩ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা। কিন্তু বর্তমান দরপত্র অনুযায়ী ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।


ডিএমটিসিএলের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জমি অধিগ্রহণ ও বেতন-ভাতা বাদ দিলে ভারতে প্রতি কিলোমিটার মেট্রো নির্মাণে ব্যয় হয় ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা। ভারতও বিদেশি ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও ঠিকাদার নিয়োগে প্রতিযোগিতা সীমিত করে এমন শর্ত মানে না।


কচুক্ষেত থেকে ভাটারা পর্যন্ত একটি পাতাল অংশের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা। সেখানে সর্বনিম্ন দর এসেছে ১৫ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা, যা প্রাক্কলনের চেয়ে প্রায় ৩৯১ শতাংশ বেশি। ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ এই অস্বাভাবিক দর গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই ধরনের দরপত্র প্রক্রিয়ায় দুটি প্যাকেজেই মাত্র দুটি কনসোর্টিয়াম চূড়ান্তভাবে অংশ নেয়, যা ‘যোগসাজশের’ সন্দেহ সৃষ্টি করেছে।


উত্তরা–মতিঝিল লাইনে চলাচলকারী মেট্রো রেল থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। অথচ ২০৩০-৩১ সাল পর্যন্ত বছরে ঋণের কিস্তি হিসেবে পরিশোধ করতে হবে ৪৬৫ থেকে ৭৪০ কোটি টাকা।


এ পরিস্থিতিতে ডিএমটিসিএল সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনে চিঠি দিয়ে প্রকল্প দুটির ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন ও প্রস্তাব সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে। ব্যয় কমাতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং ঋণের শর্ত পুনর্বিবেচনার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। তবে নতুন সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।


বুয়েটের অধ্যাপক সামছুল হক বলেছেন, ঠিকাদার নিয়োগে প্রতিযোগিতা না থাকায় ব্যয় বাড়ছে এবং এভাবে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে অর্থনীতির ওপর বড় চাপ পড়বে। তার মতে, ব্যয় কমাতে হলে ঋণের শর্ত পরিবর্তন করে প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।


এদিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে তারেক রহমান ঢাকায় মেট্রোরেলের পাশাপাশি মনোরেল চালুর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, নতুন সরকার ব্যয়বহুল এই দুটি প্রকল্প নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়।


সৌজন্যে: প্রথম আলো