বৃহস্পতিবার , ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বৃহস্পতিবার , ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হোমবিশ্বযুক্তরাষ্ট্র থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের সোনা ব্রিটেনে সরাল নেদারল্যান্ডস

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের সোনা ব্রিটেনে সরাল নেদারল্যান্ডস

favicon
ভোরের আলো ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের সোনা ব্রিটেনে সরাল নেদারল্যান্ডস

বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় থাকা নিজেদের সোনার মজুদের বড় একটি অংশ ব্রিটেনে সরিয়ে নিয়েছে নেদারল্যান্ডস। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে যাতে সোনার মজুদ দ্রুত ব্যবহার করা যায়, সে প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ডিএনবি) জানিয়েছে, সোনার মজুদের অবস্থান পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে তারা তীব্র সংকট মোকাবিলায় আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে চায়। তবে কোন ধরনের সংকটের আশঙ্কায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট করেনি ব্যাংকটি।


ডিএনবির প্রেসিডেন্ট ওলাফ স্লেইপেন বলেন, সোনার মজুদের অবস্থান পরিবর্তনের ফলে তা আরও সহজে বাজারে লেনদেনযোগ্য হয়েছে। তবে তাদের প্রত্যাশা, কখনোই এই সোনা ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে না। একই সঙ্গে সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করাও জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।


নেদারল্যান্ডসের সোনার মজুদ


নেদারল্যান্ডসের কাছে মোট ৬১২ দশমিক ৪ টন সোনা রয়েছে। বর্তমান বাজারমূল্যে এর মূল্য প্রায় ৭২ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরো বা ৮৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।


নেদারল্যান্ডস এতদিন নিজেদের সোনা দেশটির জেইস্ট শহরের ক্যাশ সেন্টার এবং যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোতে সংরক্ষণ করে আসছিল।


সাম্প্রতিক স্থানান্তরের আগে তাদের সোনার মজুদের ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল জেইস্টে, ১৮ দশমিক ১ শতাংশ লন্ডনে, ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ নিউইয়র্কে এবং ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ অটোয়ায়।


স্থানান্তরের পর এই অনুপাত দাঁড়িয়েছে—জেইস্টে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ, লন্ডনে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ, নিউইয়র্কে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং অটোয়ায় ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ।


অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার তুলনায় এখন লন্ডনে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ সোনা রাখছে নেদারল্যান্ডস।


কীভাবে সরানো হলো সোনা?


ডিএনবি জানিয়েছে, দুটি পদ্ধতিতে সোনার মজুদের পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।


প্রথমত, নিউইয়র্কে প্রায় ৫৯ টন সোনা বিক্রি করে লন্ডনে সমপরিমাণ সোনা কেনা হয়েছে। এর মূল্য ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।


দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে ২৭ টনের বেশি সোনা সরাসরি নেদারল্যান্ডসে নেওয়া হয়েছে। একই পরিমাণ আন্তর্জাতিক বাজারে মানসম্পন্ন সোনা জেইস্ট থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়েছে। ফলে পুরোনো সোনার বারগুলো নতুন করে গলানোর প্রয়োজন হয়নি।


ডিএনবির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মূল্য ধরে নিউইয়র্ক থেকে প্রায় ১০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের সোনা সরানো হয়েছে। কানাডার অটোয়া থেকে সরানো হয়েছে ১ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি মূল্যের সোনা।


কেন্দ্রীয় ব্যাংকটির মতে, দুটি পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে বড় ধরনের এই স্থানান্তরের ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে সময় ও ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখা গেছে।


কেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সোনা সরানো হলো?


ডিএনবির অন্যতম প্রধান যুক্তি হলো, তারা নিজেদের সোনার মজুদকে সহজে লেনদেনযোগ্য রাখতে চায়। এ ক্ষেত্রে লন্ডনকে তুলনামূলকভাবে কার্যকর স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।


ব্যাংকটির মতে, নিউইয়র্ক ও অটোয়ায় থাকা সোনা চরম সংকটের সময় তুলনামূলকভাবে দ্রুত ব্যবহার করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে লন্ডনে বেশি সোনা রাখলে তা বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় আরও সহজে ব্যবহারযোগ্য হবে এবং আস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।


তবে ‘সিস্টেমিক ঝুঁকি’ বলতে ঠিক কী ধরনের পরিস্থিতিকে বোঝানো হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি ডিএনবি।


### যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন কি কারণ?


নেদারল্যান্ডস যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে পরিমাণ সোনা সরিয়েছে, কানাডা থেকে তার তুলনায় অনেক কম সরানো হয়েছে। এ কারণে কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ সিদ্ধান্তটির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।


প্যারিসভিত্তিক ন্যাশনাল গোল্ড কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট লরাঁ শোয়ার্টজ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছু কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সোনা সংরক্ষণের জন্য বিকল্প স্থান বেছে নিতে উৎসাহিত করতে পারে।


বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার বাণিজ্য বিরোধ, ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাত এবং ইউরোপের সঙ্গে ওয়াশিংটনের বাড়তে থাকা টানাপোড়েনকে সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।


### রাশিয়ার সম্পদ জব্দের প্রভাব


অন্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখা রিজার্ভ কতটা নিরাপদ—এ প্রশ্নও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুরুত্ব পেয়েছে।


২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের সার্বভৌম সম্পদ জব্দ করে। রাশিয়ার মোট প্রায় ৬৪০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক সম্পদের প্রায় অর্ধেকই এর আওতায় পড়ে।


২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জি-৭ দেশগুলো এসব জব্দ করা সম্পদ থেকে পাওয়া মুনাফা ব্যবহার করে ইউক্রেনের জন্য ৫০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্যাকেজ তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ জব্দের মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন।


এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেদের রিজার্ভ অন্য দেশের হাতে রাখার ঝুঁকি নতুন করে বিবেচনা করছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ভবিষ্যতে কোনো দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে বিদেশে রাখা রিজার্ভ আটকে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই সোনা সংরক্ষণের স্থান নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আরও সতর্ক হতে পারে।


নেদারল্যান্ডসের সাম্প্রতিক পদক্ষেপও সেই বৃহত্তর বৈশ্বিক আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে দেখা হচ্ছে।