রংপুরের চার খুনে নতুন মোড়, আদালতে সাক্ষী শান্তের জবানবন্দি
রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ার (দাসপাড়া) আলোচিত চার খুনের ঘটনায় তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। মামলার অন্যতম আসামি সিদ্ধার্থ দাস তার কাছে চারজনকে হত্যার কথা স্বীকার করেছিলেন—এমন দাবি করে শান্ত দাস নামে এক যুবক আদালতে ১৬৪ ধারায় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।
সিদ্ধার্থের শরীরে আঁচড়ের দাগ দেখে এর কারণ জানতে চাওয়ার পরই তার কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের কথা জানতে পারেন বলে আদালতে জানিয়েছেন শান্ত।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রংপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের আদালতে শান্ত দাসের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক জিন্নাত আলী।
তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, গত ২২ আগস্ট রাতে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস শান্ত দাসের কাছ থেকে তিনটি ইয়াবা কেনেন। এ সময় শান্ত সিদ্ধার্থের শরীরে আঁচড়ের দাগ দেখতে পান। বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় তিনি আঁচড়ের কারণ জানতে চান।
তখন সিদ্ধার্থ শান্তকে বলেন, ‘আমি গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজনকে হত্যা করেছি।’ সিদ্ধার্থের মুখে এমন কথা শুনে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন শান্ত। পরে তিনি স্বেচ্ছায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি জানান।
ডিবি সূত্র জানায়, তদন্তে শান্ত দাস ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানেন বলে উঠে এসেছে। এ কারণে তার বক্তব্য আদালতে আইনগতভাবে রেকর্ড করা হয়েছে। জবানবন্দিতে তিনি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে নিজের জানা তথ্য তুলে ধরেছেন।
তদন্তকারীরা শান্তের জবানবন্দিতে পাওয়া তথ্য আসামিদের দেওয়া বক্তব্য, অন্যান্য সাক্ষীদের বক্তব্য এবং এখন পর্যন্ত পাওয়া আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন।
এ নিয়ে আলোচিত চার হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত তিনজন সাক্ষী আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা হলেন সীমান্ত দাস, বিদ্যুৎ ও শান্ত দাস। বিদ্যুৎ হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি শ্মশানের পাহারাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বলে জানা গেছে।
প্রসঙ্গত, গত ২২ আগস্ট রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় পুলিশ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করে। পরে তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। এরপর কোতয়ালী থানা থেকে মামলার তদন্তের দায়িত্ব নেয় ডিবি।
হত্যাকাণ্ডের কারণ, পরিকল্পনা, ঘটনার আগে ও পরে আসামিদের গতিবিধি এবং অন্য কেউ জড়িত কি না—এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
তবে তদন্তে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য ও বক্তব্য নিয়ে ইতোমধ্যে নানা প্রশ্নও উঠেছে। বিশেষ করে আসামিদের মাদক সেবন, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, ঘটনার সময় এবং হত্যার পর তাদের গতিবিধি নিয়ে পাওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। এরই মধ্যে আসামিদের ডোপ টেস্টের ফল নিয়েও আগের কিছু বক্তব্যের সঙ্গে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা জিন্নাত আলী বলেন, মামলার তদন্ত এখনো চলমান। শান্ত দাসের জবানবন্দিতে পাওয়া তথ্যসহ অন্যান্য আলামত ও আসামিদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো তথ্যকে চূড়ান্তভাবে ধরে নেওয়া হচ্ছে না।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শান্ত দাসের আদালতীয় জবানবন্দি চার হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে তার দেওয়া তথ্য কতটা সত্য এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এর কী ধরনের যোগসূত্র রয়েছে, তা অন্যান্য সাক্ষ্য, আলামত ও আসামিদের বক্তব্য যাচাইয়ের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
চার হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন, হত্যার নেপথ্যের কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা নিশ্চিত করতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।