ইরান যুদ্ধে ছয় মাসে জ্বালানিতে মার্কিনদের অতিরিক্ত ব্যয় ১০০ বিলিয়ন ডলার
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত শুরুর পর গত ছয় মাসে জ্বালানি কিনতে মার্কিন ভোক্তাদের অতিরিক্ত প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের একটি ট্র্যাকারের তথ্যের বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান শুরুর পর দেশটির সব ৫০টি অঙ্গরাজ্যেই পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বেড়েছে। এতে সম্মিলিতভাবে মার্কিন ভোক্তাদের অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে আনুমানিক ১৩ কোটি ১০ লাখ পরিবার রয়েছে। সে হিসাবে প্রতিটি পরিবারকে গড়ে জ্বালানির পেছনে অতিরিক্ত প্রায় ৭৬৩ ডলার ব্যয় করতে হয়েছে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে শুরু থেকেই অসন্তোষ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির জন্যও অনেক মার্কিন নাগরিক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দায়ী করছেন।
তবে জ্বালানির দাম বাড়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘দাম বাড়লে বাড়ুক।’ বরং মূল্যবৃদ্ধির জন্য তিনি তেল কোম্পানিগুলোকে দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত মুনাফা করার অভিযোগ তুলেছেন।
### পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধ গড়িয়েছে ষষ্ঠ মাসে
ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর পর ট্রাম্প বলেছিলেন, সংঘাত চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সেই সময়সীমা অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। যুদ্ধ এখন ষষ্ঠ মাসে প্রবেশ করলেও কূটনৈতিক সমাধানের কোনো স্পষ্ট অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
সংঘাতের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে পেট্রোলের দাম। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের তুলনায় পেট্রোলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় এর প্রভাবও তুলনামূলক বেশি।
যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম ছিল প্রায় ২ দশমিক ৯৮ ডলার। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৫ ডলারে। অর্থাৎ ছয় মাসে দাম বেড়েছে প্রায় ৩৯ শতাংশ।
অন্যদিকে, ডিজেলের দাম বেড়েছে আরও বেশি। প্রতি গ্যালন ডিজেলের দাম ৩ দশমিক ৬৭ ডলার থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ৯০ ডলারে উঠেছে। অর্থাৎ দাম বেড়েছে ৬০ শতাংশেরও বেশি।
### যুক্তরাষ্ট্রে কোথায় জ্বালানির দাম সবচেয়ে বেশি?
অঙ্গরাজ্যভেদে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দামে বড় পার্থক্য রয়েছে। সাধারণত পশ্চিম উপকূলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোতে জ্বালানির দাম বেশি। এর মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ায় দাম সর্বোচ্চ।
যুদ্ধ শুরুর আগেই উচ্চ জ্বালানি কর ও মূল্য নির্ধারণসংক্রান্ত নীতির কারণে ক্যালিফোর্নিয়ায় জ্বালানির দাম তুলনামূলক বেশি ছিল। যুদ্ধের পর সেখানে মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বেড়েছে।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, ক্যালিফোর্নিয়ায় বর্তমানে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম ৫ দশমিক ৮৫ ডলার। এরপর রয়েছে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্য ৫ দশমিক ৫১ ডলার, হাওয়াই ৫ দশমিক ৩৯ ডলার, আলাস্কা ৫ দশমিক ০৩ ডলার এবং ওরেগন ৫ দশমিক ০১ ডলার।
অন্যদিকে, সবচেয়ে কম দামে পেট্রোল পাওয়া যাচ্ছে ইন্ডিয়ানায়। সেখানে প্রতি গ্যালনের গড় দাম ৩ দশমিক ৪৩ ডলার।
### জ্বালানির দাম বাড়লে বাড়ে খাদ্যের দামও
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু গাড়ি চালানোর খরচে সীমাবদ্ধ নয়। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও বাজারজাত—প্রায় প্রতিটি ধাপেই তেল ও গ্যাসের ব্যবহার রয়েছে।
কৃষিতে সার উৎপাদন, ট্রাক্টর ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি চালানো এবং খাদ্য সংরক্ষণের হিমাগারে শীতলীকরণ ব্যবস্থা পরিচালনায় জ্বালানি প্রয়োজন। একইভাবে খাদ্য প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত প্লাস্টিক এবং পণ্য পরিবহনের ট্রাকও জ্বালানিনির্ভর।
ফলে তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও পরিবহনের প্রতিটি ধাপেই খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ গিয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর। অর্থাৎ সুপারমার্কেটের তাক পর্যন্ত খাদ্য পৌঁছানোর আগেই এর দামে কয়েক দফা অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হয়।
বিশেষ করে নিম্নআয়ের দেশগুলোতে এর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। এসব দেশের মানুষ আয়ের তুলনামূলক বড় অংশ খাদ্য কিনতে ব্যয় করেন। পাশাপাশি অনেক দেশ খাদ্যশস্য ও কৃষি সারের বড় অংশ আমদানি করে।
তাই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে এসব দেশে দ্রুত খাদ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে। পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে খাদ্যসংকট তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।