পে-অর্ডারের সাড়ে ২৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে
জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসির এক সাবেক শাখা ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জমা দেওয়া সাড়ে ২৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তার নাম মো. আহসান হাবিব।
অভিযোগ রয়েছে, অন্য একটি হিসাব নম্বরে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে ওই টাকা তুলে নেওয়া হলেও পরে তা ফেরত দেওয়া হয়নি। ঠিকাদারদের দাবি, কাজ শেষ করে পৌরসভার প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র নেওয়ার পরও তাদের জমা দেওয়া নিরাপত্তা জামানতের টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি।
ঠিকাদারদের অভিযোগ ও নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৫ মে কালাই পৌরসভার উন্নয়নকাজের টেন্ডার সিকিউরিটি ও পারফরমেন্স সিকিউরিটি বাবদ তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে পাঁচটি টেন্ডার আইডির বিপরীতে এনআরবিসি ব্যাংকের ক্ষেতলাল উপশাখায় অর্থ জমা দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো মেসার্স রুবিনা কনস্ট্রাকশন, মেসার্স আব্দুল্লাহ জুনায়েদ ট্রেডার্স ও তুলসীগঙ্গা ট্রেডার্স।
নথি অনুযায়ী, ব্যাংকের ঋণ সুবিধাসহ পাঁচটি টেন্ডার আইডিতে মোট অর্থের পরিমাণ ছিল ৪৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩১০ টাকা। এর মধ্যে ঠিকাদারদের নিজস্ব জমা ছিল ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
পরে ২০২৫ সালের ৭ মে কালাই পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলীর নামে পাঁচটি পে-অর্ডার ইস্যু করা হয়। ঠিকাদারদের দাবি, পে-অর্ডার নেওয়ার পর তারা কাজের অনুমতি পান এবং কাজ শেষ করে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রও সংগ্রহ করেন।
অভিযোগকারীদের দেওয়া লেনদেনের তথ্য অনুযায়ী, পে-অর্ডার ইস্যুর পাঁচ দিন পর ১২ মে তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক আহসান হাবিব দুটি চেকের মাধ্যমে যথাক্রমে ৯ লাখ ৫৯ হাজার ৬৭৫ টাকা ও ৬ লাখ ২১ হাজার ৮২৫ টাকা তুলে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মেসার্স ফকির করপোরেশনের হিসাবে স্থানান্তর করেন। ঠিকাদারদের দাবি, এভাবেই তাদের জমা দেওয়া অর্থ অন্য হিসাবে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এ ছাড়া মেসার্স আব্দুল্লাহ জুনায়েদ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. তহিদুল বারী শেখের পক্ষ থেকেও পারফরমেন্স সিকিউরিটি বাবদ জমা ৮ লাখ ১০ হাজার টাকা ফেরত না পাওয়ার পৃথক অভিযোগ রয়েছে। তার আবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের নভেম্বরে ই-জিপি টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে তার প্রতিষ্ঠান কালাই পৌরসভা থেকে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড পায়। পরে ১৩ নভেম্বর নগদ ৮ লাখ ১০ হাজার টাকা দিয়ে এনআরবিসি ব্যাংকের ক্ষেতলাল উপশাখা থেকে পে-অর্ডার করা হয়।
তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মোট ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা ফেরত চেয়ে ২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। আবেদনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
মেসার্স রুবিনা কনস্ট্রাকশনের কর্ণধার রেজাউল ইসলাম বলেন, ব্যাংকের ওপর আস্থা রেখে তারা নিরাপত্তা জামানতের টাকা জমা দিয়েছিলেন। কাজ শেষ করে পৌরসভার ছাড়পত্র নেওয়ার পরও টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি। জমাকৃত টাকা সম্পূর্ণ ফেরত দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
একই দাবি করেন আব্দুল্লাহ জুনায়েদ ট্রেডার্সের কর্ণধার মো. তহিদুল বারী শেখ ও তুলসীগঙ্গা ট্রেডার্সের কর্ণধার ওয়াশিম আকরাম চঞ্চল।
তবে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এনআরবিসি ব্যাংকের ক্ষেতলালের সাবেক উপশাখা ব্যবস্থাপক মো. আহসান হাবিব। তিনি বলেন, কালাই পৌরসভার সঙ্গে তার সুসম্পর্কের কারণে সংশ্লিষ্ট লেনদেনের ক্ষেত্রে দাপ্তরিক প্রক্রিয়া অনুসরণে একটি ভুল হয়েছিল। তবে সেই ভুল সংশোধনের আগেই তাকে ওএসডি করে ব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। ফলে অভিযোগকারীদের টাকা ফেরতের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেননি বলে দাবি করেন তিনি।
আহসান হাবিব আরও দাবি করেন, তিনি কোনো অর্থ আত্মসাৎ করেননি।
এদিকে এনআরবিসি ব্যাংকের ক্ষেতলাল উপশাখার ব্যবস্থাপক মো. আব্দুল কাইয়ুম অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, অভিযোগকারীদের বিষয়ে তিনি জানেন; তবে সাংবাদিকরা ব্যাংকের গ্রাহক নন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ বা দুদকের কেউ নন। তাই তাদের কোনো তথ্য দিতে তিনি বাধ্য নন।
তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি নিজের বড় ভাই ঢাকার প্রেস ক্লাব নিয়ন্ত্রণ করেন—এমন দাবি করে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।