ইরানজুড়ে সহিংস দমন: শত শত নিহতের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার হুমকি
সরকারি দমন-পীড়ন আরও কঠোর হওয়ায় ইরানজুড়ে চলমান বিক্ষোভ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, দেশজুড়ে সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৪৯৫ জন বিক্ষোভকারী ও ৪৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। গত দুই সপ্তাহে আটক হয়েছেন প্রায় ১০ হাজার ৬০০ জন।
তেহরানের কাছে একটি মর্গের ভিডিও ফুটেজে বিবিসি অন্তত ১৮০টি লাশের ব্যাগ দেখতে পেয়েছে। তেহরান থেকে বিবিসিকে দেওয়া এক সূত্র জানান, পরিস্থিতি যুদ্ধক্ষেত্রের মতো—রাস্তায় রক্ত, গুলির শব্দ এবং ট্রাকে করে লাশ সরানোর দৃশ্য নিত্যদিনের হয়ে উঠেছে।
বিক্ষোভকারীদের হত্যার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে হামলার হুমকি দিয়েছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরান স্বাধীনতার দিকে এগোচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিতে প্রস্তুত। যদিও তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি, তবে সিবিএস নিউজকে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিভিন্ন বিকল্প ট্রাম্পকে জানানো হয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব বিকল্পের মধ্যে রয়েছে অনলাইন বিরোধী কার্যক্রম জোরদার, সাইবার হামলা এবং নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ। এদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ইসরায়েলসহ গোটা অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ও নৌঘাঁটিগুলো বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
প্রথমে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাসনের অবসানের দাবিতে রূপ নিয়েছে। ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল ঘোষণা দিয়েছেন, বিক্ষোভে অংশ নেওয়াদের ‘ঈশ্বরের শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে—যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। খামেনি বিক্ষোভকারীদের ‘ধ্বংসাত্মক ভাঙচুরকারী’ বলে অভিহিত করেছেন।
রোববার ইরান সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতীয় লড়াইয়ে নিহতদের স্মরণে তিন দিনের শোক ঘোষণা করে। একই সময়ে বিবিসিকে দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, একাধিক হাসপাতালে নিহত ও আহত বিক্ষোভকারীদের ভিড় উপচে পড়ছে। তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সীমিত থাকায় তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার থেকে ইন্টারনেট শাটডাউন জারি থাকায় পরিস্থিতি যাচাই আরও জটিল হয়েছে। তবুও কিছু ভিডিওতে তেহরান প্রদেশের কাহরিজাক ফরেনসিক কেন্দ্রে সারি সারি লাশের ব্যাগ, স্বজনদের কান্না ও আহাজারির দৃশ্য দেখা গেছে। জীবিতদের নিরাপত্তার স্বার্থে এসব ভিডিও ঝাপসা করা হয়েছে।
বিবিসি ভেরিফাই নিশ্চিত করেছে, মাশহাদসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষের ভিডিও সাম্প্রতিক। কোথাও বাসে অগ্নিসংযোগ, কোথাও এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ ও সেতু থেকে গুলি ছোড়ার দৃশ্য ধরা পড়েছে। তেহরানের গিশা, পুনাক ও হেরাভি এলাকায় শাসন অবসানের দাবিতে মিছিলের ভিডিওও যাচাই করা হয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করলেও এর পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। তবে বিবিসি পার্সিয়ান ও বিবিসি ভেরিফাই যাচাইকৃত ফুটেজে তেহরান, কেরমানশাহ ও বুশেহরসহ বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিবর্ষণের দৃশ্য নিশ্চিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের ইন্টারনেট বন্ধ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি কঠোর। গবেষক আলিরেজা মানাফি জানান, কিছু মানুষ স্টারলিংক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সংযোগের চেষ্টা করতে পারে, তবে এতে শনাক্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।