ডিসেম্বরকে ঘিরে নতুন কৌশলে আ.লীগ, গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ডিসেম্বরকে সামনে রেখে নতুন কৌশলে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দলটির নেতাকর্মীদের সংঘবদ্ধ করা, পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারের উচ্চপর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রের দাবি, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দলটির নেতাকর্মীদের একটি অংশকে সংগঠিত করার চেষ্টা চলছে। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। নারায়ণগঞ্জের সাবেক নেতা শামীম ওসমানের একটি ভিডিওতেও ডিসেম্বরকে সামনে রেখে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গত দুই সপ্তাহে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের কয়েকটি ঝটিকা মিছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে এসেছে। বনানী, ময়মনসিংহ, শরীয়তপুর, সাভার ও সুনামগঞ্জের ঘটনাগুলো নিয়ে বিশেষভাবে সতর্ক রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এরই মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের বিভিন্ন ইউনিটকে সতর্ক করে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ময়মনসিংহের গাঙ্গিনাপাড় এলাকায় ঝটিকা মিছিল প্রতিরোধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে একটি পুলিশ ফাঁড়ির পুরো টিম প্রত্যাহার করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
বিশ্লেষক ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের জন্য দ্রুত রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসা সহজ হবে না। তাদের ধারণা, মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখা এবং দলীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই ডিসেম্বরকে সামনে রেখে এমন তৎপরতা চালানো হতে পারে।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ব্যবহার করে কেউ কেউ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করতে পারেন। তবে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের কারণে এ ধরনের প্রচেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন তিনি।
একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। আগাম তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের কিছু নেতাকর্মী বিদেশে অবস্থানরত দলীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে এ যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলেও সূত্রের দাবি।
এদিকে রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় আত্মগোপনে থাকা রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের কেউ কেউ বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনের আড়ালে অবস্থান করছেন—এমন তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ককটেল ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনাকেও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো মহলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তবে বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা আগের তুলনায় বেড়েছে। জনগণের সহযোগিতা থাকলে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা প্রতিহত করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং নিয়মিত গ্রেফতার করা হচ্ছে। কোনো মহল বিশেষ উদ্দেশ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে কি না, সে বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হবে।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, ডিসেম্বরের মধ্যে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার আলোচনা মূলত রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখার কৌশল হতে পারে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে দলটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে আসা সহজ নয় বলেও মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, বিগত সরকারের কর্মকাণ্ডের দায় এবং সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বিষয়টি আওয়ামী লীগের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে দলটি দ্রুত রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারবে—এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।