শনিবার , ১৭ অক্টোবর ২০২৬
শনিবার , ১৭ অক্টোবর ২০২৬
হোম › বিশ্ব › নেপালে টানেলে আটকে শ্রমিকদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা

নেপালে টানেলে আটকে শ্রমিকদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা

favicon
ভোরের আলো ডেস্ক:
নেপালে টানেলে আটকে শ্রমিকদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা

নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন ত্রিশূলী এলাকার বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে কর্মরত শ্রমিকরা। পাহাড়ের গভীরে নির্মিত এসব টানেলে হঠাৎ পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ ঢুকে পড়ায় অনেক শ্রমিক আটকা পড়েন।


বিভিন্ন টানেলে প্রায় এক হাজার শ্রমিক কাজ করছিলেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তারা নিজেরাই কাদা ও পলিতে ভরা টানেল থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। তবে আরও অনেকে ভেতরে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


ত্রিশূলী থ্রি-এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের টানেলে শনিবার রাত থেকে রোববার পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। আটকে থাকা ব্যক্তিদের কাছে বাতাস ও খাবার পৌঁছাতে টানেলের ওপর থেকে ড্রিল করে গর্ত করার চেষ্টা করছেন উদ্ধারকারীরা।


### রিং আঁকড়ে ছয় ঘণ্টা


মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের সঙ্গে কথা বলেছেন বেঁচে ফেরা কয়েকজন শ্রমিক ও তাদের স্বজন। তাদের একজন রাম চন্দ্র। ত্রিশূলী নদীর তীরের একটি টানেলে কাজ করার সময় হঠাৎ পানি, কংক্রিট ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত তার দিকে ধেয়ে আসে।


পরিস্থিতি সামাল দিতে টানেলের ছাদে থাকা একটি রিং শক্ত করে আঁকড়ে ধরেন তিনি। প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে একেকটি রিং ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যান তিনি ও তার সহকর্মীরা।


রাম চন্দ্র বলেন, পানি বাড়তে থাকায় তার পা নাড়ানোও কঠিন হয়ে পড়েছিল। রিংটি ছেড়ে দিলে তিনি পড়ে যেতে পারতেন। পরে নিজের পায়ের নিচে রাখার জন্য একটি টিনের শিট টেনে নেন এবং সেটি দলের অন্য সদস্যদেরও ব্যবহার করতে দেন।


তিনি জানান, তারা ছয়জন ছিলেন। পরে টানেলের প্রবেশমুখের কাছে আরও একজনকে সঙ্গে পান। শেষ পর্যন্ত সবাই টানেল থেকে বের হতে সক্ষম হন।


### পাহাড়ে উঠে প্রাণ বাঁচান মদন


বেঁচে যাওয়া আরেক শ্রমিক মদন সিং বুধা। ভয়াবহ ঢল আঘাত হানার সময় তিনি আপার ত্রিশূলী সুড়ঙ্গ নম্বর-২-এর রাতের শিফট শেষ করে বাইরে বের হয়েছিলেন।


মদন সিং জানান, বাইরে তাকিয়ে তিনি চারদিকে শুধু পানি দেখতে পান। এরপর প্রাণ বাঁচাতে পাহাড়ের দিকে দৌড় শুরু করেন। পাথুরে পাহাড়ের খাঁজে জন্মানো ঘাস আঁকড়ে ধরে তারা ওপরে উঠতে থাকেন। যারা ওপরে উঠতে পারেননি, তারা পানির স্রোতে ভেসে যান।


বেঁচে ফেরার পরও শ্রমিকদের অনেকেই নিখোঁজ সহকর্মীদের খোঁজে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন। তাদের কেউ কেউ নিজের আত্মীয় বা বন্ধুকেও হারিয়েছেন।


### স্বজন হারিয়ে শোক


ভক্তি রাম বোহরা জানান, তার ধারণা অনুযায়ী আশপাশের বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় এক হাজার শ্রমিক কাজ করছিলেন। নিখোঁজদের মধ্যে তার ভগ্নিপতিও রয়েছেন। তার স্ত্রী বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা বলেও জানান তিনি।


ট্যুর গাইড অমর বিস্তা ওই প্রকল্পে কাজ করতেন না। তবে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের অনেকেই সেখানে কর্মরত থাকায় দুর্যোগের খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান।


অমর বলেন, যারা নিখোঁজ হয়েছেন তারা সবাই তার এলাকার মানুষ। অনেক রাত তিনি কান্নায় ঘুমাতে পারেন না। স্বজনদের সন্তান হারানোর ঘটনাও তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।


উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, কেউই আর সেই টানেলের ভেতরে ফিরতে চান না। কিন্তু সবাই তাদের বন্ধু ও সহকর্মীদের ফিরিয়ে আনতে চান।


### বাড়ি ফেরার অপেক্ষা


টানেলগুলোতে কর্মরত অধিকাংশ শ্রমিক নেপালের দূর পশ্চিমাঞ্চলের জুমলা জেলার বাসিন্দা। তারা কয়েক সপ্তাহ করে পরিবারের কাছ থেকে দূরে থেকে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করতেন এবং উপার্জনের অর্থ গ্রামের বাড়িতে পাঠাতেন।


দুর্যোগের পর বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের একটি দল বাসে করে রাজধানী কাঠমান্ডুর উদ্দেশে রওনা হয়। সেখান থেকে তাদের জুমলায় পরিবারের কাছে ফেরার কথা রয়েছে।


অমর বিস্তা বলেন, তারা তাদের নিখোঁজ বন্ধুদের ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। জীবিত অবস্থায় সম্ভব না হলেও অন্তত তাদের মরদেহ পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।